অ্যান্ড্রোক্লিস ও সিংহ: দয়ার প্রতিদানের ঈশপের গল্প

বাচ্চাদের গল্প · 2026-10-08

পড়ার বয়স: ৫ থেকে ৮ বছর · গল্পের শিক্ষা: দয়ার প্রতিদান

দ্রুত উত্তর: অ্যান্ড্রোক্লিস ও সিংহ ঈশপের একটি ছোট নীতিগল্প। এক দয়ালু মানুষ সিংহের পায়ের কাঁটা বের করে দেয়, আর পরে বিপদের সময় সেই সিংহই তার পাশে দাঁড়ায়। গল্পটি ৫–৮ বছরের শিশুকে দয়া ও কৃতজ্ঞতা শেখায়, তবে বাস্তবে আহত প্রাণীকে নিজে না ছুঁয়ে বড়দের ডাকাই নিরাপদ।

এক দয়ালু মানুষ বনের ভেতর হাঁটছিল। হঠাৎ সে শুনল, "গর্‌র্‌র্‌! উ-উ-উ!" সিংহের কান্নার শব্দ!

সে ভয় পেল, কিন্তু আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। দেখল, একটা সিংহ পা তুলে কাতরাচ্ছে। তার পায়ে একটা বড় কাঁটা ফুটে আছে! "আহা বেচারা!"

লোকটা ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বলল, "ভয় পেয়ো না, আমি তোমাকে সাহায্য করব।" সে সাবধানে কাঁটাটা টেনে বের করল। সিংহ হাল্কা করে "গর্‌র্‌র্‌" বলে ধন্যবাদ জানাল, আর তার হাত চেটে দিল।

কিছুদিন পর সেই মানুষটা কোনো কারণে বিপদে পড়ল, লোকজন তাকে আটকে রাখল। সে মুক্তি চাইছে, এমন সময় সেই সিংহটা ঠিক এসে হাজির! সিংহ মানুষটাকে চিনতে পেরে তার পাশে দাঁড়াল, আর সবাই অবাক হয়ে দেখল, বন্য সিংহও দয়া মনে রাখে!

লোকজন মানুষটাকে ছেড়ে দিল। সে সিংহের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, "তুমি আমার সত্যিকারের বন্ধু!"


ভেবে দেখো

১. মানুষটা কেন সিংহকে সাহায্য করল? ভয় লাগেনি?

২. সিংহ কীভাবে প্রতিদান দিল?

৩. ভয় পেলেও কি কখনো সাহায্য করা উচিত? (বড়দের সাথে মিলে)

দয়া কখনো হারিয়ে যায় না, কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসে।

বাড়িতে করার মতো কাজ

পায়ে কাঁটা/ব্যান্ডেজ নিয়ে খেলনা ডাক্তারি খেলা।

এই গল্প শিশুকে কী শেখায়?

গল্পটা ছোট, কিন্তু এর ভেতরে কয়েকটা বড় কথা লুকিয়ে আছে। পড়ার পর শিশুর সাথে এগুলো নিয়ে গল্প করলে শিক্ষাটা মনে গেঁথে যায়।

  • দয়া ফিরে আসে। কাঁটা বের করে দেওয়ার সময় মানুষটা কিছু পাওয়ার আশায় সাহায্য করেনি। তবু সেই ভালো কাজই পরে তাকে বাঁচিয়েছে। শিশুকে বোঝান, আমরা ভালো কাজ করি ভালো লাগার জন্য, পুরস্কারের জন্য নয়।
  • ভয় আর সাহস পাশাপাশি থাকতে পারে। মানুষটা ভয় পেয়েছিল, তবু আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। সাহস মানে ভয় না থাকা নয়, ভয় নিয়েও ভেবেচিন্তে কাজ করা।
  • কৃতজ্ঞতা মনে রাখা। সিংহ উপকারের কথা ভোলেনি। এটা শিশুকে "ধন্যবাদ" বলার অভ্যাস শেখানোর সুন্দর উদাহরণ।
  • চেহারা দেখে বিচার নয়। সিংহকে সবাই ভয়ংকর ভাবে, অথচ তার ভেতরেও ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা ছিল।

গল্পটা শিশুকে কীভাবে পড়ে শোনাবেন?

ঈশপের এই নীতিগল্প শুনতে মাত্র কয়েক মিনিট লাগে। তাই বিছানায় শোয়ার আগের সময়টা বা বিকেলের শান্ত সময়, দুটোই চলে। ধাপগুলো এমন হতে পারে:

  1. শুরুর আগে একটা প্রশ্ন করুন। "সিংহের পায়ে কাঁটা ফুটলে ও কী করবে বলো তো?" এতে শিশু গল্পের ভেতরে ঢুকে যায়।
  2. কণ্ঠ বদলান। সিংহের কান্না গম্ভীর ও নরম, মানুষটার গলা ধীর ও মমতাভরা। শিশু হাসবে, মনোযোগও ধরে থাকবে।
  3. কাঁটা বের করার জায়গায় থামুন। জিজ্ঞেস করুন, "লোকটা কেন সিংহের কাছে গেল? তোমার হলে কী মনে হতো?"
  4. গল্প শেষে নিজের ভাষায় বলতে দিন। শিশু যদি গল্প আবার নিজের মতো বলতে পারে, বুঝবেন সে অনুসরণ করেছে।
  5. শিক্ষাটা শিশুর মুখ থেকেই শুনুন। আপনি আগে বলে দেবেন না। "দয়া নিয়ে তোমার কী মনে হলো?" বলে অপেক্ষা করুন।

গল্পের শিক্ষা বাস্তব জীবনে কীভাবে কাজে লাগাবেন?

ভয় পেলেও কি সাহায্য করা উচিত?

গল্পে মানুষটা নিজের হাতে সিংহের কাঁটা বের করেছিল। বাস্তবে শিশুকে এটা শেখানো ঠিক হবে না। আহত বা ব্যথায় কাতর প্রাণী, এমনকি রাস্তার কুকুর-বিড়ালও, ভয় পেয়ে আঁচড়ে বা কামড়ে দিতে পারে। তাই শিশুকে স্পষ্ট করে বলুন: কোনো আহত প্রাণী দেখলে নিজে হাত দেবে না, দূর থেকে দেখে সাথে সাথে বড়দের ডাকবে। বড়কে জানানোও একটা সাহায্য।

বন্ধুকে সাহায্য করা কীভাবে শেখাবেন?

বাস্তব জীবনে শিশুর "কাঁটা" মানে ছোট ছোট সমস্যা: খেলার মাঠে বন্ধু পড়ে গেছে, কেউ টিফিন আনতে ভুলেছে, কেউ নতুন স্কুলে একা বসে আছে। এসব সময়ে এগিয়ে গিয়ে সাহায্য করা বা শিক্ষককে জানানোই গল্পের দয়ার বাস্তব রূপ। স্কুল থেকে ফিরে জিজ্ঞেস করুন, "আজ কাউকে কি সাহায্য করেছ?" এই ছোট প্রশ্ন ধীরে ধীরে অভ্যাস বানিয়ে দেয়।

একটি সম্ভাব্য কথোপকথন

মা: গল্পে সিংহটা কেন কাঁদছিল?

শিশু: ওর পায়ে কাঁটা ফুটেছিল।

মা: লোকটা তখন কী করল?

শিশু: ভয় পেয়েছিল, তবু গিয়ে কাঁটাটা বের করে দিল।

মা: সিংহ তখন কী করল?

শিশু: হাত চেটে দিল! আর পরে লোকটাকে বাঁচাল।

মা: তোমার কি মনে হয়, সিংহ কেন তাকে ভোলেনি?

শিশু: কারণ লোকটা ওর সাথে ভালো ব্যবহার করেছিল।

মা: ঠিক বলেছ। আমরা কাউকে সাহায্য করলে সে-ও আমাদের মনে রাখে।

আরও কিছু ঘরোয়া কাজ

  • দয়ার খাতা: একটা খাতায় প্রতি রাতে একটা ছোট ভালো কাজের ছবি আঁকুন, যেমন বন্ধুকে পেনসিল দেওয়া।
  • ধন্যবাদ কার্ড: কেউ আপনার সন্তানকে সাহায্য করলে (শিক্ষক, দারোয়ান, দাদি) তাকে একটা হাতে আঁকা কার্ড দিতে বলুন।
  • অভিনয়: একজন সিংহ, একজন মানুষ। অভিনয়ের শেষে ভূমিকা বদলে নিন। অভিনয় করলে সহমর্মিতা বোঝা সহজ হয়।

যা করবেন না

  • সিংহের গল্প শুনে শিশুকে সত্যিকারের প্রাণীর কাছে গিয়ে সাহায্য করতে উৎসাহ দেবেন না।
  • "ভালো কাজ করলে প্রতিদান পাবে" কথাটাকে লোভে পরিণত করবেন না। প্রতিদান আসুক বা না আসুক, দয়ার কাজটা নিজেই সুন্দর।
  • শিশু শিক্ষাটা না বুঝলে বকবেন না। আবার একদিন গল্পটা পড়ুন, তার অন্য রকম ভাবনা শুনতে পাবেন।
  • সিংহকে সবসময় "খারাপ প্রাণী" বলে দাগিয়ে দেবেন না।

সাধারণ প্রশ্ন

৫ থেকে ৮ বছরের শিশুর জন্য এই গল্প কি উপযুক্ত?

হ্যাঁ। গল্পটা ছোট, ঘটনার ক্রম সহজ, আর শিক্ষাও স্পষ্ট। ছোটদের জন্য আপনি পড়ে শোনাতে পারেন, আর ৭-৮ বছরের শিশু নিজেই পড়ে আপনাকে গল্পটা শোনাতে পারে।

সিংহের গল্প শুনে শিশু ভয় পেলে কী করব?

গল্পের সিংহ আসলে বন্ধুসুলভ, তবু কিছু শিশু গর্জনের অংশে ভয় পায়। সেক্ষেত্রে গর্জন নরম করে পড়ুন, ছবি আঁকিয়ে সিংহকে হাসিমুখে আঁকতে বলুন। ভয় থাকলে জোর করবেন না, অন্য সময় আবার চেষ্টা করুন।

এই গল্প থেকে প্রতিদানের আশায় ভালো কাজ করার ধারণা কি তৈরি হতে পারে?

হতে পারে, তাই আলোচনায় জোর দিন যে মানুষটা সাহায্য করেছিল কারণ সিংহ কষ্টে ছিল, প্রতিদানের কথা ভাবেনি। প্রতিদান ছিল একটা সুন্দর বোনাস।

মিস পিয়ার মূল কথা: 🌼 দয়ার ছোট্ট কাজ কখনো হারিয়ে যায় না, কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসে। শিশুর সাথে গল্পটা নিয়ে গল্প করুন, আর নিজের ছোট ছোট দয়ার কাজ তাকে দেখান। সে আপনাকে দেখেই শিখবে।

আরও পড়ুন