আরহামের নতুন বন্ধু ও শীতের পিঠার গল্প, ভাগ করে নেওয়ার সুখ

বাচ্চাদের গল্প · 2026-10-12

"আমার ছেলে নিজের খেলনা বা খাবার কাউকে দিতে চায় না। কেউ ছুঁলেই কেঁদে একাকার করে। শিশুদের গল্প শুনিয়ে কীভাবে ভাগাভাগি ও সহমর্মিতা শেখাব?" "শীতকালে গ্রামে বা শহরে অন্যকে সাহায্য করার আনন্দ শিশুরা কীভাবে অনুভব করতে পারে? কোনো মিষ্টি গল্প আছে কি?"

শিশুরা জন্মগতভাবে নিজের চারপাশকে শুধু নিজের কেন্দ্রবিন্দু মনে করে। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে যখন তারা দেখতে পায় যে অন্যকে ভালোবেসে নিজের খাবার বা আনন্দ ভাগ করে নিলে নিজের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায়, তখনই তার মনে প্রকৃত মানবিকতার বীজ অঙ্কুরিত হয়। আমাদের ব্লগে আরহাম ও শেয়ারিংয়ের আনন্দ গল্পটি শিশুদের মাঝে এই সুন্দর অভ্যাস গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

দ্রুত উত্তর: আরহামের নতুন বন্ধু ও শীতের পিঠার গল্পটি শিশুদের শেখায় যে খাবারের আসল স্বাদ একা খেলে মেলে না, বন্ধুদের সাথে ভাগ করে খেলে মেলে। কনকনে শীতে খেজুরের গুড়ের ভাপা পিঠা একজন নতুন একাকী বন্ধুর সাথে ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে আরহাম ও টুনি বন্ধুত্ব ও সহমর্মিতার এক অনুপম শিক্ষা উপহার দেয়।

কুয়াশাঢাকা সকাল ও দাদীর গরম পিঠার সুবাস

পৌষের এক মিষ্টি কুয়াশাঘেরা সকাল। চারিদিকে হালকা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা ভাসছে, আর গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু ভোরের আলোয় মুক্তোর দানার মতো জ্বলজ্বল করছে। আরহাম তার গায়ে জড়িয়েছে লাল রঙের গরম সোয়েটার আর মাথায় পরেছে টুপি।

রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে মিষ্টি খেজুরের গুড় আর নারকেলের এক অপূর্ব সুবাস। আরহাম দৌড়ে গিয়ে দেখল, দাদী মা মাটির চুলার পাশে বসে ভাপা পিঠা বানাচ্ছেন। ভাপ ওঠা গরম পিঠার ওপর দেওয়া হয়েছে ঘন বাদামী গুড় আর সাদা নারকেল কোরা।

ঠিক তখনই রান্নাঘরের জানালায় এসে বসল তাদের ছোট্ট চঞ্চল বন্ধু টুনি পাখি। শীতে টুনির পালকগুলো ফুলে গোল বলের মতো হয়ে আছে। টুনি কিচিরমিচির করে বলল, "আরহাম! কী মিষ্টি গন্ধ! আমারও খুব খিদে পেয়েছে!"

দাদী মা হেসে আরহামের হাতে একটি মাটির সরায় দুটো গরম ভাপা পিঠা দিলেন। বললেন, "আরহাম দাদুভাই, তোমার আর টুনির জন্য পিঠা তৈরি। বাইরে রোদে বসে খাও।" শীতের দিনের আনন্দ ও সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের শীতের পিঠা উৎসবের গল্প পড়তে পারেন।

বটের তলায় একাকী শিশুটিকে দেখে কী হলো?

আরহাম আর টুনি সরা হাতে নিয়ে বাড়ির সামনের বড় মাঠের দিকে গেল। সেখানে মিষ্টি রোদ উঠেছে। তারা যখন মাঠে যাচ্ছিল, তখন বটের গাছের ছায়ায় আরহামের চোখে পড়ল একটি নতুন ছেলে। ছেলেটির গায়ে একটা পাতলা পুরোনো জামা, আর সে চুপচাপ মাটির ওপর বসে একটা ভাঙা কাঠের টুকরো দিয়ে দাগ কাটছে। তার চোখ দুটো খুব বিষণ্ন।

টুনি গাছের ডালে উড়ে গিয়ে উঁকি দিল। টুনি ফিরে এসে আরহামকে ফিসফিস করে বলল, "আরহাম, ও তো আমাদের গ্রামের নতুন ছেলে সামিন। ওর কোনো বন্ধু নেই, আর মনে হয় ওর সকালের নাস্তাও খাওয়া হয়নি।"

আরহাম তার হাতের গরম পিঠার দিকে তাকাল। পিঠা দুটো এত নরম আর মিষ্টি যে লোভ সামলানো কঠিন। তার পেটও চোঁ-চোঁ করছিল।

আরহামের মনে পড়ল মিস পিয়ার সেই মিষ্টি কথাগুলো—"আনন্দ একা জমিয়ে রাখলে কমে যায়, কিন্তু ভাগ করে নিলে আকাশছোঁয়া হয়।" বন্ধুর মন ভালো করার বিষয়ে আমাদের টুনির মিষ্টি রঙের খেলার গল্প পড়ে দেখতে পারেন।

আরহাম কীভাবে তার নতুন বন্ধুকে আপন করে নিল?

আরহাম একটুও দ্বিধা না করে ধীরপায়ে সামিনের কাছে এগিয়ে গেল। হাসিমুখে বলল, "হ্যালো! আমি আরহাম, আর ও আমার বন্ধু টুনি। তুমি এখানে একা বসে কী করছ?"

সামিন একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। বলল, "আমি সামিন। আমরা এই গ্রামে নতুন এসেছি। এখানে আমার কোনো খেলার বন্ধু নেই।"

আরহাম তখন মাটির সরাটি দুজনের মাঝে রাখল। ভাপ ওঠা ধোঁয়ায় চারপাশ ভরে গেল। আরহাম সবচেয়ে বড় পিঠাটি ভেঙে অর্ধেকটা সামিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "দাদীর হাতের গরম ভাপা পিঠা খুব মজা! একা খেতে ভালো লাগছে না, তুমি আমার সাথে খাবে?"

সামিন অবাক হয়ে তাকাল। তার মুখে এক চিলতে রোদ এসে পড়ল। সে হাত বাড়িয়ে পিঠার টুকরোটি নিল। প্রথম কামড়েই গুড়ের মিষ্টি স্বাদে সামিনের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সামিন বলল, "এত মিষ্টি পিঠা আমি কখনো খাইনি!"

টুনি ডানা ঝাপটে তাদের দুজনের মাঝখানে এসে বসল। টুনি বলল, "কিচিরমিচির! পিঠার গন্ধ যত মিষ্টি, আরহামের মনটা তার চেয়েও মিষ্টি!" তিনজন মিলে শীতের মিষ্টি রোদে বসে হাসতে হাসতে পিঠা খেল।

গল্প থেকে শিশু কী কী শিক্ষণীয় গুণাবলি শেখে?

এই গল্পটি শিশুদের অন্তরে ৩টি অমূল্য চারিত্রিক গুণের বিকাশ ঘটায়:

গল্পের বিশেষ মুহূর্তশিশুর বাস্তব জীবনের শিক্ষামা-বাবার আলোচনার ক্ষেত্র
গরম পিঠা সামিনকে দেওয়ানিজের প্রিয় জিনিস ভাগ করে নেওয়াস্কুলে টিফিন শেয়ার করার অভ্যাস
অপরিচিত শিশুর কাছে এগিয়ে যাওয়ানতুন মানুষের সাথে সহজে বন্ধুত্ব গড়ালাজুক শিশুকে মেশার সাহস জোগানো
শীতে অন্যের কষ্টের অনুভূতি বোঝাসহমর্মিতা ও দয়া প্রদর্শন করাআশেপাশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো

সামাজিক মেলবন্ধন ও একাকীত্ব কাটানোর সহজ উপায় জানতে শিশু বন্ধু পাতাতে পারে না ও মেশার অভ্যাস লেখাটি অত্যন্ত সহায়ক।

মাঠে নতুন খেলার আনন্দে তিন বন্ধু

পিঠা খাওয়া শেষ হতেই তাদের পেটের ক্ষুধা আর মনের একাকীত্ব দুটোই দূর হয়ে গেল। সামিন তখন তার পকেট থেকে দুটো রঙিন মার্বেল বের করল। সে হেসে বলল, "আরহাম, চলো আমরা মাটিতে মার্বেল খেলার দাগ কাটি!"

আরহাম, সামিন আর টুনি দুপুর পর্যন্ত সেই মাঠে মনের আনন্দে দৌড়াদৌড়ি করল, হাসল আর খেলা করল। একাকী সামিন পেল তার প্রাণের বন্ধু, আর আরহাম পেল নিজের খাবার ভাগ করে নেওয়ার সেই স্বর্গীয় সুখ—যা হাজার টাকা দিয়েও কেনা যায় না।

বাড়ি ফিরে আরহাম দাদীকে জড়িয়ে ধরে বলল, "দাদী, তুমি ঠিকই বলেছিলে! পিঠা যখন সামিনের সাথে ভাগ করে খেলাম, মনে হলো পিঠার স্বাদ দশগুণ বেশি মিষ্টি হয়ে গেছে!" দাদী মা হেসে আরহামের মাথায় চুমু খেলেন।

মা-বাবা কীভাবে এই গল্প নিয়ে শিশুর সাথে আলোচনা করবেন?

গল্পটি শেষ করে বাচ্চার সাথে নিচের ৩টি সুন্দর প্রশ্ন নিয়ে খোলামেলা কথা বলুন: ১. "আরহাম যখন সামিনকে পিঠা দিল, তখন তোমার কেমন লেগেছে?" ২. "তোমার ক্লাসে কি এমন কোনো বন্ধু আছে যে একা বসে থাকে? তুমি কীভাবে তার সাথে খেলবে?" ৩. "শীতকালে আমরা কীভাবে আমাদের সাহায্যকারী ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়াতে পারি?"

মিস পিয়ার মূল কথা: পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ লুকিয়ে থাকে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর ভেতরে। আপনার সন্তানের থালা থেকে এক টুকরো খাবার অন্য শিশুর সাথে ভাগ করার শিক্ষা দিন—এই ছোট্ট ভালোবাসাই একদিন পৃথিবীকে সুন্দর করে তুলবে। 🌼

আরও পড়ুন