শিশুর অবচেতন মনে মা-বাবার ঝগড়ার মারাত্মক প্রভাব ও উত্তরণের উপায়

প্যারেন্টিং · 2026-10-08

"ও তো ছোট, ও কিছু বোঝে না।" অথচ পরদিন সকালে চার বছরের মেয়ে পুতুলকে বকছে, "চুপ করো, আর ঝগড়া কোরো না!"

প্রতিটি সংসারে মতভেদ হয়। দুজন মানুষ একসাথে থাকলে কখনো গলা চড়বেই। এই লেখা কাউকে দোষারোপ করার জন্য নয়। আমি জানি, দিনের শেষে ক্লান্ত দুজন মানুষ কতটা চেষ্টা করেন। আজ শুধু বোঝার চেষ্টা করব, শিশু আমাদের ঝগড়ার সময় ভেতরে ভেতরে কী অনুভব করে, আর কীভাবে আমরা তাকে সুরক্ষিত রাখতে পারি।

দ্রুত উত্তর: মা-বাবার মতভেদ স্বাভাবিক, কিন্তু ঘন ঘন চিৎকার ও কর্কশ ঝগড়া শিশুর মনে ভয় ও অনিরাপত্তা তৈরি করতে পারে, এমনকি সে ঘুমিয়ে বা ছোট থাকলেও। শান্ত বিরতি নেওয়া, কঠিন আলোচনা আলাদা সময়ে করা আর সামনে ঝগড়া হলে শিশুকে আশ্বাস দিয়ে "মেরামত" করা, এই তিনটা অভ্যাস সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়।

শিশু আসলে কী টের পায়?

ছোট শিশুরা কথার অর্থ পুরোপুরি না বুঝলেও কণ্ঠস্বরের কর্কশতা, মুখের ভঙ্গি, দরজা বন্ধের শব্দ আর বাড়ির থমথমে ভাব ঠিকই ধরতে পারে। তাদের কাছে মা-বাবা পৃথিবীর নিরাপদ খুঁটি। সেই খুঁটি যখন কাঁপে, শিশু ভেতরে ভেতরে অস্থির হতে পারে। এটাকে আমি অবচেতন প্রভাব বলছি এই অর্থে যে, শিশু নিজে ব্যাখ্যা করতে না পারলেও তার আচরণে সেটা ফুটে উঠতে পারে।

মনে রাখা দরকার, মাঝেমধ্যে মতভেদ এবং তা শান্তভাবে মিটিয়ে নেওয়া শিশুর জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং এটি একটি শিক্ষা। যা উদ্বেগের, তা হলো বারবার, তীব্র, অপমানজনক বা ভীতিকর ঝগড়া, যার পর কোনো মিটমাট শিশু দেখে না।

শিশুর মধ্যে যেসব ইঙ্গিত দেখা যেতে পারে

এগুলো রোগনির্ণয়ের তালিকা নয়, কেবল লক্ষণীয় আচরণ। এগুলোর অনেক কারণ থাকতে পারে:

  • বেশি আঁকড়ে থাকা বা মা-বাবার কাছছাড়া হতে না চাওয়া।
  • ঘুমে অসুবিধা, বিছানা ভেজানো, দুঃস্বপ্ন।
  • খিটখিটে ভাব বা হঠাৎ রাগ।
  • পুতুল খেলায় বা আঁকায় ঝগড়ার দৃশ্য।
  • নিজেকে দোষ দেওয়া, যেমন "আমি দুষ্টু বলে তোমরা ঝগড়া করো।"
  • খেলাধুলা বা পড়ায় মনোযোগ কমে যাওয়া।
  • অতিরিক্ত ভালো হয়ে থাকার চেষ্টা, যেন সবাইকে খুশি রাখতে হবে।

বিশেষ করে শেষ দুটি, নিজেকে দোষ দেওয়া এবং অতিরিক্ত ভালো থাকার চেষ্টা, আমাকে বেশি ভাবায়, কারণ শিশু তখন বড়দের সমস্যার ভার নিজের কাঁধে নিয়ে ফেলে।

ধাপে ধাপে কী করবেন

১. নিজের প্রতিক্রিয়া চিনুন

প্রথম কাজ নিজেদের দিকে তাকানো। ঝগড়ার সময় কী হয়: চিৎকার, বাসনপত্র ছোড়া, নীরবতার শাস্তি? কোনটা সবচেয়ে ভীতিকর শিশুর কাছে, তা ভাবুন। এরপর সিদ্ধান্ত নিন, সেটা শিশুর সামনে আর করবেন না।

২. "বিরতি" নিয়ম ঠিক করুন

আপনাদের দুজনের মধ্যে একটা সংকেত ঠিক করুন, যেমন হাত তুলে বলা, "আমি একটু থামছি, আধঘণ্টা পর কথা বলব।" রাগের সময় সবচেয়ে ক্ষতিকর কথাগুলো বেরোয়। ঠান্ডা হয়ে কথা বললে সমাধান সহজ হয়।

৩. কঠিন আলোচনা আলাদা সময়ে

শিশু ঘুমালে বা বাইরে থাকলে গুরুতর বিষয় আলোচনা করুন। তবে ঘুমন্ত ভেবে উঁচু গলায় নয়, কারণ তারা অনেক সময় আধো ঘুমে শুনতে পায়।

৪. যদি সামনেই ঝগড়া হয়ে যায়, মেরামত করুন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এটি। ঝগড়ার পর শিশুর সামনে মিটমাটের অংশটুকু দেখান। কাছে ডেকে বলুন, "আমরা একটু রেগে গিয়েছিলাম। এটা বড়দের বিষয়, তোমার কোনো দোষ নেই। আমরা এখন ঠিক আছি, আমরা তোমাকে ভালোবাসি।" মনে রাখবেন, শিশুকে নিখুঁত মা-বাবা দেখাতে হবে না, ভুল শুধরানো মানুষ দেখালেই যথেষ্ট।

৫. শিশুকে কখনো মধ্যস্থতাকারী বানাবেন না

"তোমার বাবাকে বলো..." বা "মায়ের কথা শুনে ভেবো না" ধরনের কথা শিশুকে দুই পক্ষের মাঝখানে ফেলে। তাকে এই ভার থেকে মুক্ত রাখুন।

৬. নিরাপদ অনুভূতি ফিরিয়ে আনুন

রুটিন ঠিক রাখুন: একসাথে খাওয়া, গল্প, ঘুমের আগের গান। দিনে অন্তত দশ মিনিট মোবাইল ছাড়া, শুধু তার সাথে। শিশুর আদরের চাহিদা এই সময়ে বাড়তে পারে, তাকে সময় দিন।

৭. অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দিন

আঁকার মাধ্যমে বা পুতুল দিয়ে খেলতে দিন। প্রশ্ন করুন, "ঝগড়া শুনলে তোমার কেমন লাগে?" উত্তর যা-ই আসুক, বিচার না করে শুনুন।

কী বলবেন: নমুনা কথোপকথন

পাঁচ বছরের আয়ান ঝগড়ার পর কোণে বসে আছে।

মা: (পাশে বসে) আয়ান, আমরা একটু জোরে কথা বলছিলাম। তুমি কি ভয় পেয়েছ? আয়ান: হ্যাঁ। আমি কি দুষ্টুমি করেছি? মা: না সোনা, একদমই না। এটা বাবা আর আমার বিষয় ছিল। কখনো কখনো বড়রাও রেগে যায়, তারপর ঠিক করে নেয়। আয়ান: তোমরা কি আর ঝগড়া করবে না? মা: আমরা চেষ্টা করব শান্তভাবে কথা বলতে। ভুল হলে আবার ঠিক করে নেব। তোমাকে আমরা সবসময় ভালোবাসব।

যা করবেন না

  • শিশুকে কোনো একজনের পক্ষ নিতে বলবেন না।
  • একজনের সম্পর্কে অন্যজনের কুৎসা শিশুর কাছে বলবেন না।
  • সন্তানের সামনে গায়ে হাত তোলা, জিনিস ছোড়া বা ভয় দেখানো থেকে বিরত থাকুন।
  • ঝগড়ার পর কিছু হয়নি এমন ভান করবেন না।
  • শিশুর সামনে বিচ্ছেদের হুমকি দেবেন না।
  • সন্তানের কাছে নিজের মানসিক ভার ঢালবেন না।

কখন বিশেষজ্ঞের (শিশু মনোবিদ/স্কুল কাউন্সেলর) সাহায্য নেবেন

যদি ঝগড়া ঘন ঘন হয় এবং সন্তানের ঘুম, খাওয়া, পড়াশোনা বা আচরণে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়, অথবা সে নিজেকে বা অন্যকে আঘাত করার কথা বলে, তাহলে দেরি না করে শিশু মনোবিদ বা স্কুল কাউন্সেলরের সাথে কথা বলুন। দম্পতি হিসেবে নিজেরাও কাউন্সেলিং নিতে পারেন, এটি দুর্বলতা নয়। যদি ঘরে শারীরিক নির্যাতন বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে, তবে নির্ভরযোগ্য স্বজন, স্থানীয় সহায়তা সংস্থা বা প্রশাসনের সাহায্য নিন। শিশুর নিরাপত্তা সবার আগে।

সাধারণ প্রশ্ন

শিশু ঘুমিয়ে থাকলে কি ঝগড়া করা ঠিক আছে?

ঘুমন্ত শিশুও শব্দে জেগে উঠতে পারে। চেষ্টা করুন কঠিন আলোচনা অন্য ঘরে বা অন্য সময়ে করতে।

ঝগড়া একেবারে না করা কি সম্ভব?

না, এবং দরকারও নেই। লক্ষ্য হলো সম্মানের সাথে মতভেদ প্রকাশ করা এবং মিটমাট করা।

আমরা আলাদা থাকছি, শিশু কীভাবে সামলাবে?

সহজ ভাষায় সত্য কথা বলুন, তার দোষ নেই তা স্পষ্ট করুন, উভয় অভিভাবকের ভালোবাসা নিশ্চিত করুন এবং রুটিন ঠিক রাখুন।

ইতোমধ্যে অনেক ঝগড়া সামনে করেছি, আর কি ঠিক হবে?

হ্যাঁ। আজ থেকে মেরামতের অভ্যাস শুরু করলে শিশু ধীরে ধীরে নিরাপত্তা ফিরে পায়।

🥣 মিস পিয়ার মূল কথা: শিশুর জন্য নিখুঁত দাম্পত্য নয়, নিরাপদ ঘরই দরকার। মতভেদ হবে, কিন্তু শান্ত হওয়া, মিটমাট করা আর সন্তানকে বলা যে এটা তার দোষ নয়, এটুকুই আপনার ঘরকে আবার ভরসার জায়গা করে তুলবে।

আরও পড়ুন