B এবং D, কিংবা ৯ এবং ৭ উল্টো লেখা: মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ও তা সমাধানের উপায়

ফনিক্স ও ভাষা · 2026-10-06

"বাচ্চা কি ডিসলেক্সিয়ায় ভুগছে? সব অক্ষর কেন উল্টো করে লেখে?"

ক্লাসে একদিন একজন বাবা খাতা হাতে এসে প্রায় কাঁপা গলায় এই প্রশ্নটা করেছিলেন। খাতায় ছয় বছরের ছেলের লেখা 'bed' হয়ে গেছে 'deb', আর ৭ এঁকেছে আয়নার ছবির মতো উল্টো করে। আমি তাঁকে প্রথমেই বলেছিলাম, চা খেয়ে একটু বসুন, ঘাবড়ানোর মতো কিছু হয়নি।

অনেক সচেতন অভিভাবক সন্তানের খাতায় যখন দেখেন সে 'b'-কে 'd', কিংবা 'p'-কে 'q' লিখেছে, তখন দারুণ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

শান্ত হোন! ৩ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঘটনাকে বলা হয় মিরর রাইটিং (Mirror Writing) বা উল্টো লেখা। এটি সাধারণত শিশুর অক্ষর চেনার স্বাভাবিক একটি শেখার ধাপ। শুধু এই কারণে কাউকে কোনো রোগের তকমা দেওয়া ঠিক নয়।

দ্রুত উত্তর: ৩–৭ বছর বয়সে B-কে D বা ৭ উল্টো লেখা সাধারণত শেখার স্বাভাবিক ধাপ, রোগ নয়। রোজ ৫–১০ মিনিট বাতাসে হাত ঘুরিয়ে, বালিতে এঁকে আর রঙের সংকেত দিয়ে অনুশীলন করান। বড় হয়েও টানা সমস্যা থাকলে শিশু চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।

কেন এমন হয়?

একটি কাপ যেভাবেই ঘুরিয়ে রাখা হোক না কেন, শিশু জানে ওটা একটা কাপ। ডান দিকে ঘোরানো কুকুর আর বাম দিকে ঘোরানো কুকুর, দুটোই কুকুর। জীবনের শুরু থেকে শিশুর মস্তিষ্ক এভাবেই জিনিস চিনতে অভ্যস্ত।

কিন্তু বর্ণমালায় এসে নিয়মটা হঠাৎ উল্টে যায়! একই গোল আর দাগ ডানপাশে গেলে হয় 'b', আর বামপাশে গেলে হয়ে যায় 'd'। মস্তিষ্ক এই সূক্ষ্ম অভিমুখ (Directionality) বুঝতে কিছুদিন সময় নেয়। তাছাড়া ডান-বাম নিয়ে ধারণা পাকা হতেও সময় লাগে। তাই এটা শিশুর অমনোযোগ বা অবাধ্যতা নয়, শেখার পথেরই অংশ।

কীভাবে শিশুকে এই বিভ্রান্তি থেকে বের করে আনবেন? নিচে ধাপে ধাপে কয়েকটা সহজ কৌশল দিলাম।


১. 'BED' (বিছানা) টেকনিক

  • দুই হাত দিয়ে শিশুর সামনে দুটি থাম্বস-আপ (Thumbs Up) করতে বলুন।
  • বাম হাত দিয়ে তৈরি হবে 'b'-এর গোল পেট, আর ডান হাত দিয়ে হবে 'd'-এর গোল পিঠ।
  • মাঝখানে একটি কাল্পনিক বিছানা কল্পনা করুন: b-e-d!
  • বাম পাশে মাথা (b), ডান পাশে পা (d)। এই ভিজ্যুয়াল ক্লু দিলে শিশুর গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা অনেক কমে আসে।

২. 'ব্যাট আগে, নাকি বল আগে?'

  • b: লেখার সময় আগে লম্বা লাঠি (ব্যাট) আঁকতে হয়, তারপর গোল পেট (বল)। তাই ব্যাট দিয়ে বল মারো = b!
  • d: লেখার সময় আগে গোল পেট (ডোনাট) আঁকতে হয়, তারপর লম্বা লাঠি। তাই ডোনাট আগে = d!

৩. বাতাসে হাত ঘোরানো (Air Tracing)

খাতায় বারবার ভুল করে কাটাকাটি করলে শিশুর আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়।

  • চোখ বন্ধ করে পুরো হাত বাতাসে বড় করে ঘুরিয়ে 'b' এবং 'd' আঁকার চর্চা করান (Gross Motor Movement)।
  • মস্তিষ্কে বড় আকারের স্মৃতি দ্রুত রেকর্ড হয়।

৪. ঘরোয়া উপকরণে হাত দিয়ে অনুভব করা

যা লাগবে: একটা থালায় অল্প চাল বা সুজি, মোটা দড়ি বা সুতো, আর ময়দার খামির।

  • থালার চালে আঙুল দিয়ে শিশুকে 'b' আর 'd' আঁকতে দিন। প্রতিবার লাঠি আগে, তারপর গোল।
  • দড়ি বা খামির দিয়ে অক্ষর বানিয়ে ছুঁয়ে দেখতে দিন।
  • খেয়াল রাখুন, চাল-সুজি যেন মুখে না যায়। ছোট শিশু হলে পাশে বসে থাকুন।

শরীরের অনুভূতি দিয়ে শেখা অক্ষর মনে বেশি দিন থাকে।

৫. রং আর সংকেত দিয়ে চেনা

শিশুর খাতায় বা বর্ণমালার চার্টে 'b' সবসময় লাল এবং 'd' সবসময় নীল রঙে লিখুন, যাতে চোখ রঙ দেখেই অক্ষরের জায়গা মনে রাখে। কিছুদিন পর রঙ ছাড়াই চেনার চেষ্টা করান। বাংলা অক্ষরের বেলায় (যেমন ব ও র, ধ ও ঘ) একইভাবে সামনে-পেছনের দিক চিহ্ন দিয়ে দেখান।

অভিভাবকের মনের কথা

অনেক সময় আমরা নিজের উদ্বেগ থেকেই বেশি চাপ দিয়ে ফেলি। মনে রাখবেন, আজ যে শিশু 'b' আর 'd' গুলিয়ে ফেলছে, কয়েক মাস পরে সে হয়তো নিজেই হেসে বলবে, "আমি তো এখন আর ভুল করি না!" শিশুর পাশে থাকুন, প্রতিদিনের ছোট অগ্রগতি খেয়াল করুন, আর খাতার ভুলের চেয়ে তার চেষ্টাকে বড় করে দেখুন। যে শিশু ভুল করতে ভয় পায় না, সে-ই সবচেয়ে দ্রুত শেখে।

এক সপ্তাহের ছোট পরিকল্পনা

  • শনি-রবি: শুধু বাতাসে আর চালের থালায় অক্ষর আঁকা।
  • সোম-মঙ্গল: 'BED' হাতের কৌশল আর ব্যাট-বলের গল্প।
  • বুধ-বৃহস্পতি: রঙিন অক্ষর চেনা এবং সহজ শব্দ লেখা, যেমন bed, dad, bad।
  • শুক্র: ছুটির দিনের মতো, শুধু একটা খেলা, কোনো লেখা নয়।

এভাবে ধারাবাহিক ছোট চর্চা কয়েক সপ্তাহে শিশুর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। মনে রাখবেন, প্রতিটি শিশুর গতি আলাদা।

কথোপকথনের নমুনা: কী বলবেন

শিশু যখন 'd'-এর জায়গায় 'b' লিখে ফেলে:

  • বলবেন না: "আবার উল্টো লিখলে! কতবার বলেছি!"
  • বলুন: "বাহ, তুমি অক্ষরটা তো ঠিকই বানিয়েছ! চলো, এবার ব্যাট আগে এঁকে দেখি কোনটা হয়।"
  • ভুল হলে ছোট একটা দাগ দিয়ে ঠিক জায়গায় আবার লিখতে দিন, লাল কালিতে বড় ক্রস দেবেন না।

যা করবেন না

  • সবার সামনে ভুল ধরে লজ্জা দেবেন না।
  • শিশুর হাত ধরে জোর করে অক্ষর বসিয়ে দেবেন না।
  • বারবার অক্ষর লেখার শাস্তি (১০০ বার লেখো) দেবেন না। ভুল অভ্যাসই পাকা হয়ে যেতে পারে।
  • নিজে নিজে "ডিসলেক্সিয়া হয়েছে" ধরে নেবেন না।

কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে ৭-৮ বছর বয়স নাগাদ এই উল্টো লেখা কমে আসে। তবে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে স্কুলের শিক্ষক বা শিশু-শিক্ষা বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন:

  • ৭-৮ বছর পেরিয়েও অক্ষর বা সংখ্যা প্রায়ই উল্টো লিখছে
  • পড়তে শেখায় স্পষ্টভাবে পিছিয়ে আছে, যেমন চেনা শব্দেও বারবার আটকে যাচ্ছে
  • পড়া বা লেখা নিয়ে শিশু খুব হতাশ হচ্ছে বা স্কুলে যেতে চাইছে না
  • পরিবারে পড়ার অসুবিধার ইতিহাস আছে

আমি এখানে কোনো রোগনির্ণয় করছি না। শুধু বলছি, বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা করে বলতে পারবেন শিশুর ঠিক কোথায় সাহায্য দরকার। দেরি না করে সহায়তা নেওয়াই ভালো।

সাধারণ প্রশ্ন

আমার ছেলের বয়স ৫, সে অনেক অক্ষর উল্টো লেখে। এটা কি চিন্তার?

সাধারণত নয়। এই বয়সে উল্টো লেখা খুব স্বাভাবিক। তবুও নিয়মিত অনুশীলন করান আর লক্ষ রাখুন সময়ের সাথে কমছে কিনা।

উল্টো লেখা মানেই কি ডিসলেক্সিয়া?

না। উল্টো লেখা ছোটদের মধ্যে খুব সাধারণ। ডিসলেক্সিয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত শুধু বিশেষজ্ঞই নিতে পারেন, এবং সেটা শুধু উল্টো লেখা দেখে নয়।

বাঁহাতি শিশু কি বেশি উল্টো লেখে?

বাঁহাতি শিশুদের অনেক সময় লেখার দিকের কারণে একটু বেশি অসুবিধা হতে পারে, কিন্তু তা শেখার ঘাটতি নয়। বাঁহাতে লেখাকে জোর করে বদলাবেন না।

রোজ কতক্ষণ অনুশীলন করাব?

৫-১০ মিনিট যথেষ্ট। অল্প সময়, কিন্তু প্রতিদিন। দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখলে বিরক্তি আসবে।


🧠 মিস পিয়ার মূল কথা:
"উল্টো লেখা মানে শিশুর মস্তিষ্ক অক্ষরের জ্যামিতি বোঝার লড়াইয়ে আছে। বকাঝকা না দিয়ে মজার ভিজ্যুয়াল ক্লু দিয়ে তার বিভ্রান্তি দূর করুন।"

আরও পড়ুন