অন্ধকার ও ভূতের ভয়: শিশুকে উপহাস না করে তার অন্তরের ভয় দূর করার বৈজ্ঞানিক উপায়

প্যারেন্টিং · 2026-10-06

"ঘরের লাইট নিভালেই কান্না! রাতে একা বাথরুমে যেতে চায় না, সারাক্ষণ ভূতের ভয়!"
অনেক মা-বাবা বিরক্ত হয়ে বলেন: "ধুর! ভূত বলে কিছু নেই, এত বড় হয়েছিস তাও ভয় পাস?"

একটু ভেবে দেখুন, বড় হিসেবে আমরা জানি অন্ধকারে কোনো দানব লুকিয়ে নেই। কিন্তু ৩ থেকে ৭ বছরের শিশুর কল্পনাশক্তি (Imagination) বাস্তব জগতের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী! তাদের মস্তিষ্কে যুক্তি ও কল্পনার সীমারেখা তখনো স্পষ্ট নয়। তাই তাদের কাছে এই ভয় শতভাগ বাস্তব ও ভীতিকর।

শিশুর ভয়কে উড়িয়ে দিলে বা উপহাস করলে সে ভয় পাওয়া বন্ধ করে না, বরং মা-বাবার সাথে মনের কথা বলা বন্ধ করে দেয়।

দ্রুত উত্তর: শিশুর অন্ধকার বা ভূতের ভয়কে উড়িয়ে না দিয়ে আগে মেনে নিন, তারপর টর্চলাইটের খেলা, ডিম লাইট আর শান্ত ঘুমের রুটিন দিয়ে ধীরে ধীরে সাহস গড়ুন। ভয় অনেক দিন ধরে খুব তীব্র থাকলে শিশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কেন এই বয়সে ভয় বেশি আসে?

এই বয়সে শিশুর কল্পনা দ্রুত বাড়ে, গল্পের চরিত্র আর বাস্তব মানুষ মিলেমিশে যায়। অন্ধকারে চোখ কিছু দেখতে না পেলে মন নিজে থেকেই ছবি বানিয়ে ফেলে: পর্দার ছায়া হয়ে যায় দানব, কাপড়ের স্তূপ হয়ে যায় ভূত। তাছাড়া দিনের বেলা দেখা কার্টুন, শোনা গল্প বা কারও ভয় দেখানো কথা রাতে মনে ফিরে আসে। অন্ধকার ও আলাদা শোয়ার ভয় শিশুদের মধ্যে বেশ সাধারণ এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বয়সের সাথে সাথে কমে যায়।

আসুন জেনে নিই, কীভাবে ধৈর্য আর ভালোবাসা দিয়ে শিশুর এই ভয় দূর করবেন:


১. ভয়ের অনুভূতিকে মর্যাদা দিন (Validate, Don't Dismiss)

উপহাসের বদলে বলুন:

  • "আমি বুঝতে পারছি অন্ধকারে তোমার ভয় লাগছে। কিন্তু আমি তোমার পাশেই আছি, কোনো ক্ষতি হবে না।"
  • শিশুকে বোঝান যে ভয় পাওয়া কোনো দুর্বলতা নয়। মা-বাবার উপস্থিতির নিশ্চয়তাই শিশুর সবচেয়ে বড় ঢাল।

২. 'ছায়ার জাদু' ও টর্চলাইটের খেলা

অন্ধকারকে ভীতিকর না বানিয়ে খেলার সঙ্গী বানান।

  • ঘরের বাতি নিভিয়ে একটি ছোট টর্চলাইট জ্বালান।
  • দেয়ালে হাত দিয়ে হরিণ, পাখি বা প্রজাপতির ছায়া বানিয়ে গল্প করুন।
  • পর্দার আড়ালে বা খাটের নিচে টর্চ মেরে একসাথে দেখুন: "দেখো তো, এটা কোনো ভূত নয়, এটা তোমার নীল রঙের জামাটা ঝুলছে!"

অজানাকে জানার মাধ্যমে ভয়ের উৎস ছোট হয়ে আসে।

নিরাপত্তার নোট: টর্চ বা বাতি শিশুর চোখে সরাসরি ধরবেন না। মোমবাতি বা খোলা আগুন কখনোই ব্যবহার করবেন না। খাটের নিচে হাত ঢোকানোর সময় পোকামাকড় বা ধারালো জিনিস আছে কিনা আগে আপনি দেখে নিন।


৩. সুরক্ষার সঙ্গী: 'সাহসী ভাল্লুক' ও ডিম লাইট

শিশুর শোবার ঘরে একটি নরম হলুদ ডিম লাইট বা স্টারি নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে রাখুন।

  • তার হাতে একটি পছন্দের টেডি বিয়ার বা কুশন দিয়ে বলুন: "এটা হলো তোমার পাহারা দেওয়া সাহসী বন্ধু! ও সারারাত তোমার পাশে বসে পাহারা দেবে।"
  • মনস্তত্ত্বে এটিকে বলা হয় 'Transitional Object', যা শিশুকে একা শোবার আত্মবিশ্বাস দেয়।

৪. ভয় দেখানোর নাটক বা আত্মীয়দের সতর্ক করুন

কখনো শিশুকে ভাত খাওয়ানোর জন্য বা ঘুম পাড়ানোর জন্য বলবেন না: "তাড়াতাড়ি ঘুমাও, নইলে পুলিশ আসবে বা ভূত ধরে নিয়ে যাবে!" এই সাময়িক সুবিধাটি শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী ভীতির বীজ বুনে দিতে পারে।

বাড়িতে দাদা-দাদি বা অন্য আত্মীয়রা থাকলে নরম গলায় বুঝিয়ে বলুন: "ও এখন এসব ভয় পায়, আমরা ভয় না দেখিয়ে অন্যভাবে ঘুম পাড়াব।"


৫. ভয়ের ছবি আঁকা ও কথা বলা

যা লাগবে: সাদা কাগজ, রঙ-পেনসিল।

শিশুকে বলুন, "তোমার ভূতটা দেখতে কেমন, এঁকে দেখাও তো!" ছবি আঁকা শেষে জিজ্ঞেস করুন, "ও কী চায়?" তারপর একসাথে ছবির ভূতকে একটা মজার নাম দিন বা হাসির কিছু যোগ করুন, যেমন মাথায় টুপি বা পায়ে জুতো। ভয়কে বাইরে এনে হাসির জিনিস বানালে মনের চাপ হালকা হয়। ছবিটা শিশুকে নিজে ছিঁড়ে ফেলতে দিতে পারেন, সে নিজের ভয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার অনুভূতি পাবে।

৬. ঘুমানোর আগের শান্ত রুটিন

ভয় কমাতে ঘুমের আগের সময়টা শান্ত রাখা খুব কাজে দেয়।

  1. রাতের খাবারের পর উত্তেজনাপূর্ণ খেলা বা ভয়ের কার্টুন বন্ধ করুন।
  2. হালকা গরম পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে নিন।
  3. একটা মজার, নিরাপদ গল্প পড়ুন, যেখানে শেষে সবাই সুখে থাকে।
  4. কিছুক্ষণ আদর করুন, দিনের একটা ভালো মুহূর্ত নিয়ে কথা বলুন।
  5. বলুন: "আমি এই পাশের ঘরেই আছি। দরজা একটু খোলা রাখছি।"

রাতে ভয় পেয়ে জেগে উঠলে

শিশু কাঁদতে কাঁদতে জেগে উঠলে আলো জ্বালান, জড়িয়ে ধরুন, আর নিচু গলায় বলুন: "আমি এখানে আছি। তুমি নিরাপদ। এটা একটা স্বপ্ন ছিল।" জেরা করবেন না, "কী দেখেছ বলো" বলে চাপ দেবেন না। শান্ত হলে পানি খাইয়ে আবার শুইয়ে দিন, আর সকালে চাইলে স্বপ্নটা নিয়ে গল্প করুন।

একা বাথরুমে যাওয়ার ধাপ

প্রথম দিন আপনি বাথরুমের দরজার বাইরে দাঁড়ান। কয়েকদিন পর দূরে দাঁড়ান। তারপর শুধু কথা বলতে থাকুন: "আমি এখানেই আছি।" এভাবে ধাপে ধাপে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ান। রাতে বাথরুমের পথে ছোট একটা নাইট লাইট রাখুন, কিন্তু সিঁড়ি বা পিচ্ছিল মেঝেতে সাবধান থাকুন।

যা করবেন না

  • "তুমি কি মেয়ে যে ভয় পাও?" বা "ছেলেদের ভয় পেতে নেই" জাতীয় কথা বলবেন না।
  • শিশুকে জোর করে অন্ধকার ঘরে একা রেখে দেবেন না। ভয় বাড়বে বই কমবে না।
  • ভূত নিয়ে রসিকতা বা ভয়ের গল্প বলবেন না।
  • ভয় পাচ্ছে বলে শাস্তি দেবেন না বা লজ্জা দেবেন না।

কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

শিশুর ভয় সাধারণত সময়ের সাথে কমে যায়। তবে নিচের ক্ষেত্রে শিশুর ডাক্তার বা শিশু মনোবিদের সাথে কথা বলুন:

  • কয়েক সপ্তাহ চেষ্টার পরও ভয়ে প্রতিদিন তীব্র কান্না, ঘুমে ব্যাঘাত বা বারবার দুঃস্বপ্নে জেগে ওঠা
  • ভয়ের কারণে স্কুলে যেতে না চাওয়া বা বন্ধুদের সাথে মিশতে না চাওয়া
  • কোনো অস্বাভাবিক ঘটনার (দুর্ঘটনা, হারিয়ে যাওয়া, পরিবারে বড় পরিবর্তন) পর হঠাৎ ভয় বেড়ে যাওয়া
  • খাওয়া-দাওয়া বা আচরণে স্পষ্ট পরিবর্তন

আমি রোগনির্ণয় করছি না। শুধু বলছি, সন্দেহ হলে দেরি না করে পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

সাধারণ প্রশ্ন

আমার ছেলে ৭ বছরেও অন্ধকারে ভয় পায়। এটা কি স্বাভাবিক?

হ্যাঁ, অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই এটা হয়। ধৈর্য ধরে ধাপে ধাপে চর্চা করান। বিশেষ চিন্তার কারণ থাকলে উপরের অংশ দেখে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

শিশু আমার বিছানায় এসে শুতে চাইলে কী করব?

কয়েকদিন সাথে শুতে দিলে ক্ষতি নেই। তারপর আস্তে আস্তে নিজের বিছানায় ফিরিয়ে দিন। প্রথমে আপনি তার পাশে বসুন, পরে দরজার কাছে।

ডিম লাইট কি সারারাত জ্বালিয়ে রাখা ঠিক?

অনেক পরিবারই নরম, কম আলোর ডিম লাইট সারারাত রাখে। খেয়াল রাখুন আলো যেন খুব উজ্জ্বল না হয় এবং সরাসরি চোখে না পড়ে।

কার্টুন দেখে ভয় পেলে কী করব?

ভয়ের দৃশ্য আছে এমন কার্টুন কিছুদিন বন্ধ রাখুন। শিশুর সাথে বসে কী ভয় লাগল তা নিয়ে কথা বলুন।


🌙 মিস পিয়ার মূল কথা:
"শিশুকে অন্ধকার ভয়হীন করতে হলে আগে তাকে মা-বাবার নিরাপদ আশ্রয়ের আলো দিতে হবে।"

আরও পড়ুন