শিশুর স্ক্রিন আসক্তি দূর করতে ৫টি ঘরোয়া স্ক্রিন-ফ্রি খেলা

খেলায় শেখা · 2026-10-08

"মোবাইল না দিলে করবে কী আপা? ঘরে তো কোনো খেলনাই ওর পছন্দ হয় না!"

আমার কাছে এই প্রশ্ন প্রায়ই আসে। উত্তরটা সহজ নয়, আবার কঠিনও নয়। শিশুকে স্ক্রিন থেকে সরাতে হলে শুধু "না" বললে চলে না, তার হাতে "হ্যাঁ" দিতে হয়: অর্থাৎ এমন কিছু, যা মজার, নতুন এবং আপনার সঙ্গে ভাগ করা যায়। সুখবর হলো, এর জন্য দোকান থেকে কিছু কিনতে হবে না।

দ্রুত উত্তর: শিশুকে স্ক্রিন থেকে সরাতে শুধু "না" বললে হয় না, হাতে একটা মজার "হ্যাঁ" দিতে হয়। রান্নাঘরের জিনিস, পুরোনো কাগজ, বালিশ-কম্বল, প্রকৃতি খোঁজা আর গান-নাচ, এই পাঁচটি খেলা বিনা খরচে শুরু করা যায়। আপনি পাশে থাকুন, খেলা ছোট রাখুন, আর কয়েক দিন ধৈর্য ধরুন।

কেন বিকল্প খেলা দরকার?

স্ক্রিনে শিশু খুব সহজে আনন্দ পায়। হাত না নাড়িয়েই রং, শব্দ আর গল্প তার সামনে চলে আসে। ঘরের সাধারণ খেলা সেই তুলনায় ধীর। তাই শুরুতে শিশু হয়তো মুখ ফিরিয়ে নেবে। এটা স্বাভাবিক। আপনি সঙ্গে থাকলে, খেলা ছোট ও সহজ রাখলে, আর একটু ধৈর্য ধরলে ধীরে ধীরে সে মজা পেতে শুরু করে। গবেষকরাও বলেন, বাস্তব জিনিস ছুঁয়ে, নেড়ে, ভেঙে-গড়ে শেখাই ছোট শিশুদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর।

খেলা ১: রান্নাঘরের "সুপার শেফ"

কী লাগবে: কয়েকটা বাটি, চামচ, পানি, চাল বা ডাল, একটা বড় ট্রে।

কীভাবে খেলবেন:

  • ট্রের ওপর চাল বা ডাল ঢেলে বাটি দিয়ে মাপতে দিন।
  • বলুন: "ওমা, এই বাটিতে কত ডাল ধরল? চলো ওই বড় বাটিতে ঢালি।"
  • ছোট চামচে তুলে এক বাটি থেকে আরেক বাটিতে নেওয়ার খেলা।

কী শিখবে: মাপজোখ, হাতের পেশির নিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ। ছোট দানা মুখে দিতে পারে, তাই দুই বছরের নিচে হলে সবসময় চোখে চোখে রাখুন, অথবা পানি ও বড় আকারের জিনিস ব্যবহার করুন।

খেলা ২: পুরোনো খবরের কাগজের দুনিয়া

কী লাগবে: পুরোনো খবরের কাগজ, টেপ, নরম বল।

কীভাবে খেলবেন:

  • কাগজ দলা পাকিয়ে "তুষারগোলা" বানান। ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলার প্রতিযোগিতা।
  • মেঝেতে টেপ দিয়ে সোজা বা আঁকাবাঁকা রাস্তা বানিয়ে তার ওপর দিয়ে হাঁটা।
  • কাগজ ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছবি বানানো, যেমন সূর্য বা মাছ।

কী শিখবে: শরীরের ভারসাম্য, হাত-চোখের সমন্বয়, কল্পনা। এবং সবচেয়ে ভালো কথা, শব্দ করে কাগজ ছেঁড়ার আনন্দ ছোটদের খুব প্রিয়।

খেলা ৩: বালিশের পাহাড় ও কম্বলের তাঁবু

কী লাগবে: বালিশ, চাদর, দুটো চেয়ার।

কীভাবে খেলবেন:

  • চেয়ারের ওপর চাদর ফেলে তাঁবু বানান।
  • ভেতরে টর্চ আর একটা গল্পের বই নিয়ে "ক্যাম্পিং" শুরু করুন।
  • বালিশ সাজিয়ে পাহাড় বানিয়ে তার ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পার হওয়া।

কী শিখবে: সাহস, কল্পনাশক্তি, শরীরের শক্তি। আর আপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সময় তো পাওয়া যাচ্ছেই।

খেলা ৪: প্রকৃতি খোঁজার অভিযান

কী লাগবে: একটা ঝুড়ি বা ব্যাগ, বারান্দা বা ছাদ বা পাড়ার মাঠ।

কীভাবে খেলবেন:

  • বলুন: "চলো, আজ আমরা তিনটা সবুজ পাতা, একটা মসৃণ পাথর আর একটা শুকনো ডাল খুঁজে আনি।"
  • ফিরে এসে সব জিনিস মেঝেতে সাজান, ছুঁয়ে দেখুন, গন্ধ শুঁকুন।
  • পাতা কাগজের ওপর রেখে ক্রেয়ন ঘষে ছাপ তুলুন।

কী শিখবে: পর্যবেক্ষণ, রং-আকার চেনা, প্রকৃতির প্রতি টান। মোবাইলের বাইরের পৃথিবী যে বিশাল, সেটা সে নিজেই টের পাবে।

খেলা ৫: ঘরোয়া গান আর নাচ

কী লাগবে: আপনার গলা, দুটো হাত, আর বাসার পাতিল আর চামচ।

কীভাবে খেলবেন:

  • পাতিল উল্টে ঢোল বানান, চামচ দিয়ে বাজান।
  • পরিচিত ছড়ায় তাল দিন: ধীরে, দ্রুত, আস্তে, জোরে।
  • থামার খেলা: গান চলবে, গান থামলে সবাই পাথরের মতো স্থির।

কী শিখবে: ছন্দ, শোনার ক্ষমতা, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। সঙ্গে ভাষার বিকাশ, কারণ ছড়া-গান শিশুর শব্দভান্ডার বাড়ায়।

কীভাবে শুরু করবেন: ৩ ধাপ

  1. দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন। যেমন বিকেল ৪টা থেকে ৪টা ৩০ মিনিট। এটা আপনাদের "খেলার সময়"।
  2. আপনি নিজে নামুন। শিশুকে একা খেলতে বললে সে ফোনের দিকে ফিরবে। প্রথম ১০–১৫ মিনিট আপনি সঙ্গে থাকুন, তারপর ধীরে সরে আসুন।
  3. প্রশংসা করুন কাজের, ফলের নয়। "তুমি অনেকক্ষণ চেষ্টা করেছ, দেখেই ভালো লাগছে!"

সংলাপের নমুনা

শিশু: "আমার মোবাইল লাগবে।"

আপনি: "তুমি মোবাইলের কথা ভাবছ, বুঝতে পারছি। আজ স্ক্রিন আমরা দেখব বিকেলে। এখন চলো, সুপার শেফ হয়ে ডাল মাপা যাক। দেখি, কে বেশি ভালো ঢালতে পারে, তুমি না আমি?"

খেয়াল করুন, আপনি "না" দিয়ে শুরু করেননি। বিকল্প দিয়ে শুরু করেছেন।

যা করবেন না

  • খেলার মাঝে নিজেই ফোন হাতে বসে থাকবেন না। শিশু আপনাকে দেখেই শেখে।
  • খেলা শেষ করতে জোর করবেন না। শিশু আগ্রহ হারালে অন্য খেলায় যান।
  • "এটা সুন্দর হয়নি" বা "ঠিক করে করো" বলে সংশোধন করতে থাকবেন না। খেলায় ভুল বলে কিছু নেই।
  • বিকল্প খেলাকে শাস্তি হিসেবে চাপাবেন না: "মোবাইল পাবে না, যাও খেলো!"

কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

স্ক্রিন কমানোর পরও যদি দেখেন শিশু কোনো ধরনের খেলাতেই আগ্রহ দেখায় না, চোখে চোখ রাখে না, নাম ডাকলে সাড়া দেয় না বা কথা বলার বিকাশ আপনার কাছে পিছিয়ে মনে হয়, তবে শিশু চিকিৎসক বা শিশু-বিকাশ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। এটা কোনো রোগ ধরে নেওয়া নয়, বরং নিশ্চিন্ত হওয়ার একটা উপায়।

সাধারণ প্রশ্ন

আমি তো সারাদিন কাজ করি, এত সময় কোথায় পাব?

দিনে ২০ মিনিটের মনোযোগী সময়ও অনেক। রান্নার সময় শিশুকে পাশে বসিয়ে খেলা ১ বা ৪ চালিয়ে নিন।

সে এক মিনিটেই বিরক্ত হয়ে যায়, কী করব?

স্বাভাবিক। খেলা আরও সহজ ও ছোট করুন। ধীরে ধীরে সময় বাড়বে।

বাইরে পাঠানো নিরাপদ নয়, তখন কী?

ঘরের ভেতরের খেলা ২, ৩ ও ৫ নিয়মিত চালান। জানালার পাশে বসে পাখি খোঁজাও চমৎকার।

একই খেলা বারবার খেললে সমস্যা আছে?

না, বরং বারবার খেলা শিশুকে আত্মবিশ্বাস দেয়। নতুন কিছু যোগ করুন, যেমন নতুন বাটি বা নতুন গান।

এক সপ্তাহের ছোট চ্যালেঞ্জ

প্রথম সপ্তাহে পাঁচটি খেলাই চেষ্টা করুন, প্রতিদিন একটি করে, আর বাকি দুই দিন শিশুর সবচেয়ে প্রিয় খেলাটি আবার খেলুন। রাতে এক মিনিট ভেবে দেখুন, আজ কোন খেলায় সে সবচেয়ে বেশি হেসেছে এবং কোনটিতে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। সেই খেলার ধরনটাই আপনার সন্তানের নিজস্ব আগ্রহের ইঙ্গিত। পরের সপ্তাহে সেই ধরনের আরও খেলা যোগ করুন। এভাবে আপনি আন্দাজে নয়, পর্যবেক্ষণ দিয়ে বিকল্প বাছাই করতে শিখবেন।

🥣 মিস পিয়ার মূল কথা: "স্ক্রিন থেকে সরাতে চাইলে শূন্য জায়গা রাখবেন না, সেখানে আপনার সঙ্গ আর ছোট ছোট মজা রাখুন। দামি খেলনা নয়, আপনার সময়ই শিশুর সবচেয়ে প্রিয় খেলনা।"

আরও পড়ুন