শিশুর আত্মমর্যাদাবোধ (Self-Esteem) বাড়িয়ে তোলার ১০টি ইতিবাচক কথা

প্যারেন্টিং · 2026-10-08

"ও কিছুই পারে না, সব কাজে হাল ছেড়ে দেয়।" "আমি ভালো করে আঁকি না, আমি বোকা।" আমার মেয়ে নিজের ছবি ছিঁড়ে ফেলে সেদিন এ কথা বলেছিল।

পাঁচ বছরের একটি শিশুর মুখে এমন কথা শুনলে বুক কেঁপে ওঠে। শিশুরা নিজের সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে আমাদের কথা, চাহনি আর আচরণ থেকে। আমরা যে বাক্যগুলো রোজ ব্যবহার করি, সেগুলো তার ভেতরের কণ্ঠস্বর হয়ে যায়। আজ যে কথা আপনি বলছেন, কাল সেটাই সে নিজেকে বলবে।

আত্মমর্যাদাবোধ (Self-Esteem) মানে "আমি মূল্যবান, আমি ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য, আমি চেষ্টা করলে পারব" এই বিশ্বাস। এটা অহংকার নয়। আত্মমর্যাদাবোধ ভালো থাকলে শিশু ভুল করলেও ভেঙে পড়ে না, নতুন কিছু চেষ্টা করতে সাহস পায়, আর অন্যের সাথে সুন্দরভাবে মিশতে পারে।

দ্রুত উত্তর: শিশুর আত্মমর্যাদা বাড়াতে ফাঁকা প্রশংসার বদলে চেষ্টা আর অনুভূতির কথা বলুন, যেমন "তুমি অনেক চেষ্টা করেছ, আমি দেখেছি"। রোজ একটি ইতিবাচক বাক্য, মন দিয়ে শোনা আর ভুলকে শেখার সুযোগ বানানো এই তিনটিই শুরুর জন্য যথেষ্ট।

প্রশংসা বনাম উৎসাহ

"তুমি কত সুন্দর! তুমি সেরা!" এ ধরনের প্রশংসা শুনতে ভালো, কিন্তু অতিরিক্ত বা ফাঁকা প্রশংসা শিশুকে অন্যের মতামতের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলতে পারে। বরং চেষ্টা, পদ্ধতি ও অনুভূতির দিকে নজর দিলে ভিত শক্ত হয়। ফলাফলের চেয়ে প্রচেষ্টাকে মূল্য দিন।

১০টি ইতিবাচক কথা, ও কেন এগুলো কাজ করে

১. "আমি তোমাকে ভালোবাসি, যেমনই হও।"

শর্তহীন ভালোবাসাই আত্মমর্যাদার ভিত। ভালো রেজাল্ট করলে বা কথা শুনলেই যে ভালোবাসা মেলে, এমন বার্তা যেন শিশু না পায়। রাগের পরেও বলুন, "আমি তোমার ব্যবহারে রেগে ছিলাম, কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি।"

২. "তুমি অনেক চেষ্টা করেছ, আমি তা দেখেছি।"

ফলের বদলে চেষ্টাকে স্বীকৃতি দিলে শিশু বুঝতে শেখে, চেষ্টা করাটাই মূল্যবান। ছবি যেমনই হোক, রং দিতে কত সময় দিয়েছে তা বলুন।

৩. "ভুল করলে সমস্যা নেই, ভুল থেকেই আমরা শিখি।"

ভুলের ভয় শিশুকে নতুন কিছু করতে বাধা দেয়। নিজের ছোটখাটো ভুলের গল্প বলুন, "আজ আমি ভাতে বেশি নুন দিয়ে ফেলেছিলাম, পরে সাবধানে দিলাম।"

৪. "আমি তোমার কথা শুনতে চাই।"

মন দিয়ে শোনা সবচেয়ে বড় সম্মান। মোবাইল রেখে চোখে চোখ রেখে শুনুন। শিশু বুঝতে পারে, তার ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ।

৫. "তোমার কেমন লাগছে, বলবে?"

অনুভূতিকে স্বীকৃতি দিলে শিশু জানে, রাগ, ভয়, কান্না সবই ঠিক আছে। "তুমি কাঁদছ কেন? এত কিছুতে কাঁদতে নেই!" বললে সে অনুভূতি লুকাতে শেখে।

৬. "এটা কঠিন, কিন্তু তুমি চেষ্টা করলে পারবে।"

কঠিনতাকে স্বীকার করে সাহস দিন। "এখনও" শব্দটি দারুণ: "তুমি এখনও ফিতা বাঁধতে পারো না, কিন্তু শিখছ।"

৭. "তুমি আমাদের পরিবারের জন্য খুব দরকারি।"

ছোট ছোট দায়িত্ব দিন: টেবিল সাজানো, গাছে পানি দেওয়া। তারপর বলুন, "তুমি সাহায্য করায় আমাদের কাজ সহজ হলো।" এতে সে নিজেকে অবদানকারী ভাবতে শেখে।

৮. "তুমি কী ভাবছ? তোমার মত কী?"

সিদ্ধান্তে শিশুর মতামত নিন, যেমন, আজ কোন ফল খাবে, কোথায় বেড়াতে যাবে। নিজের পছন্দের মূল্য পেলে আত্মবিশ্বাস গড়ে।

৯. "আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত।" (নির্দিষ্ট করে)

শুধু "গর্বিত" নয়, কেন তা বলুন: "তুমি ছোট বোনকে নিজের খেলনা দিলে, এতে আমি গর্বিত।" নির্দিষ্ট প্রশংসা শিশুকে বুঝিয়ে দেয়, কোন আচরণটি ভালো।

১০. "আমি এখানেই আছি, তোমার পাশে।"

নিরাপত্তার অনুভূতি শিশুকে সাহসী করে। পরীক্ষা, ইনজেকশন বা নতুন স্কুলের আগে এ কথা বিশেষ শক্তি দেয়।

ছোট ছোট অভ্যাস যা কথার সাথে মিলিয়ে চলবে

  • প্রতিদিন রাতে "আজকের ভালো তিনটি জিনিস" বলার অভ্যাস।
  • শিশুর আঁকা ছবি বা তৈরি জিনিস দেয়ালে রাখা।
  • নিজের জন্য ছোট কাজ বেছে নিতে দেওয়া।
  • ব্যর্থ হলে সমাধান একসাথে খোঁজা, কিন্তু ধরিয়ে না দেওয়া।
  • আদর, কোলে নেওয়া, চোখে তাকিয়ে হাসা, এই নীরব বার্তাগুলোও কথার চেয়ে কম নয়।

একটি ছোট দৃশ্য

সন্তান (ছবি ছিঁড়তে গিয়ে): "আমি ভালো আঁকতে পারি না!"

আপনি: "মনে হচ্ছে তুমি নিজের ওপর একটু বিরক্ত। এই ছবিতে সূর্যের রংটা আমার খুব ভালো লেগেছে। আমরা কি একসাথে দেখব, কোন অংশটা আরেকটু ভালো করা যায়?"

কয়েক মিনিট পর: "তুমি আবার চেষ্টা করলে, এটা সাহসের কাজ।" এখানে ছবির সৌন্দর্য নয়, চেষ্টা ও সাহস প্রশংসিত হয়েছে।

যা করবেন না

  • "তুই কিছুই পারিস না", "বোকা", "অলস" ধরনের লেবেল লাগাবেন না।
  • অন্য শিশুর সাথে তুলনা করবেন না।
  • সবার সামনে লজ্জা দেবেন না।
  • অতিরিক্ত প্রশংসা (সব কাজেই "অসাধারণ") করবেন না, এতে প্রশংসা মূল্য হারায়।
  • ঘুষ হিসেবে উপহার দেওয়া শুরু করবেন না, "ভালো করলে চকলেট পাবে।"
  • শিশুর হয়ে সব কাজ নিজে করে দেবেন না, এতে সে ভাবে আমি পারি না।

সাধারণ প্রশ্ন

বেশি প্রশংসা করলে কি শিশু অহংকারী হয়?

নির্দিষ্ট, সৎ ও প্রচেষ্টাভিত্তিক প্রশংসা অহংকার তৈরি করে না। ফাঁপা ও অতিরঞ্জিত প্রশংসাই সমস্যা।

শিশু ভুল করলে শাসন করব না?

অবশ্যই সীমা ঠিক রাখুন। তবে আচরণকে বলুন, শিশুকে নয়: "তুমি খারাপ" নয়, "মারামারি করা ঠিক নয়।"

আমি নিজেই ছোটবেলায় এসব শুনিনি, এখন কীভাবে শিখব?

শিখতে কখনো দেরি হয় না। প্রতিদিন একটি বাক্য দিয়ে শুরু করুন। নিজের প্রতিও দয়ালু হোন।

অনেক কম আত্মবিশ্বাস দেখলে কী করব?

দীর্ঘ সময় ধরে খুব বেশি মন খারাপ, নিজেকে ছোট ভাবা বা স্কুলে যেতে ভয় থাকলে শিক্ষক বা শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।

বয়স অনুযায়ী কথার ধরন

একই বাক্য সব বয়সে একইভাবে কাজ করে না, একটু বদলে নিন।

  • ২-৩ বছর: ছোট, সহজ ও আদরমাখা বাক্য। "তুমি পেরেছ! হাততালি!" সঙ্গে হাসি, কোল আর চুমু।
  • ৪-৫ বছর: কারণ সহ প্রশংসা। "তুমি রংগুলো মিলিয়ে সাজিয়েছ, আমার খুব ভালো লেগেছে।" এই বয়সে প্রশ্নও করুন: "তুমি এটা কীভাবে বানালে?"
  • ৬-৮ বছর: চেষ্টা ও কৌশল নিয়ে কথা। "পড়া মুখস্থের জন্য তুমি নিজের উপায় বের করেছ, সেটা চমৎকার।" ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখান।

কথার সুর ও চোখের চাহনিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নরম কণ্ঠে, চোখে চোখ রেখে বলা একটি সাধারণ বাক্য, ব্যস্ততার মাঝে বলা বড় প্রশংসার চেয়ে বেশি কাজ করে। আর মনে রাখবেন, আপনি নিজে যেভাবে নিজের ভুল সামলান, শিশু সেটাই দেখে শেখে। তাই নিজের সাথেও দয়ালু ভাষায় কথা বলুন।

🥣 মিস পিয়ার মূল কথা: "আপনার বলা কথাই একদিন শিশুর মনের ভেতরের কণ্ঠস্বর হবে। তাই আজ এমন কথা বলুন, যা সে সারাজীবন নিজেকে শোনাতে চাইবে। প্রতিদিন একটি ইতিবাচক বাক্য দিয়েই শুরু হোক।"

আরও পড়ুন