স্ক্রিন বন্ধ করলে বাচ্চা বোরড হয়? 'আমি বোর হচ্ছি' কথার ইতিবাচক উত্তর
স্ক্রিন টাইম · 2026-10-08
"মা, আমি বোর হচ্ছি! কিছু করার নেই! মোবাইল দাও না!"
মোবাইল বন্ধ করার দশ মিনিটের মধ্যেই এই বাক্যটা বাসার বাতাস ভরিয়ে তোলে। আর আপনি একবার ভাবেন, "হায়, ঠিকই তো, ওর কিছু করার নেই", পরের মুহূর্তে হাতটা চলে যায় মোবাইলের দিকে। এই অভিজ্ঞতা প্রায় প্রতিটি মায়ের।
দ্রুত উত্তর: "আমি বোর হচ্ছি" শুনে ঘাবড়াবেন না। একঘেয়েমি শিশুর কল্পনাশক্তি ও নিজে কিছু বের করার ক্ষমতা গড়ে। তার অনুভূতিটা স্বীকার করুন, তাড়াতাড়ি সমাধান না দিয়ে একটু অপেক্ষা করুন, আর একটি "বোরডম জার" থেকে নিজে আইডিয়া তুলে নিতে বলুন।
'বোর হওয়া' কি সত্যিই খারাপ?
আমরা অনেকেই মনে করি, শিশু বোর হচ্ছে মানে আমরা ব্যর্থ। অথচ আমার শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতা বলে, যে শিশুরা কিছুক্ষণ অস্থির থাকার পর নিজের মতো খেলা খুঁজে পায়, তারাই সবচেয়ে সৃজনশীল হয়।
ভেবে দেখুন, আপনার ছোটবেলার সবচেয়ে মজার স্মৃতিগুলো কী? সম্ভবত দুপুরের নিস্তব্ধতায় উঠানে মাটির হাঁড়ি-কুড়ি খেলা, ছাদে ঘুড়ি, কাগজের নৌকা। সেগুলো কেউ আমাদের জন্য সাজিয়ে দেয়নি। বোর হওয়া থেকেই এসেছিল।
একঘেয়েমি সম্পর্কে আমি সাবধানে একটা কথা বলতে চাই: আমি কোনো গবেষণার সংখ্যা বানিয়ে বলব না। কিন্তু এটুকু বলা যায়, ঘরে ঘরে দেখা যায়, নিজের হাতে আইডিয়া বের করতে পারা শিশুরা আত্মবিশ্বাসী, ধৈর্যশীল আর কম নির্ভরশীল হয়। মোবাইল সেই ফাঁকটা তাৎক্ষণিক ভরিয়ে দেয়, আর শিশু ভেতর থেকে কিছু বের করার সুযোগই পায় না।
কেন স্ক্রিন বন্ধ করলে এত তাড়াতাড়ি বোর লাগে?
কারণটা বোঝা দরকার, তাহলে রাগ আসবে না।
- স্ক্রিন খুব দ্রুত, উজ্জ্বল ও চমকপ্রদ। তার তুলনায় মাটির খেলনা বা বই ধীর মনে হয়। এটা শিশুর দোষ নয়।
- অভ্যাস। যে সময়টায় সবসময় মোবাইল ছিল, সেই সময়টা খালি থাকলে শরীর ও মন "কিছু একটা চাই" বলে।
- কী করতে হয় সে জানে না। অনেক শিশু সত্যিই জানে না, নিজে নিজে কীভাবে খেলতে হয়, কারণ কখনো সময় পায়নি।
- মনোযোগ চাওয়া। অনেক সময় "বোর হচ্ছি" মানে "আমার সাথে একটু সময় কাটাও।"
প্রথম কয়েকদিন এই অস্থিরতা বেশি থাকবে, তারপর ধীরে ধীরে কমে। এটাকে পরিবর্তনের লক্ষণ ভাবুন।
ধাপে ধাপে পরিকল্পনা
ধাপ ১: অনুভূতিটা স্বীকার করুন
"বোর হওয়ার কিছু নেই!" বা "তোমার এত খেলনা, তবু বোর?" বলবেন না। এতে শিশু বোঝে, তার অনুভূতি গুরুত্বহীন। বলুন: "হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে কিছু করতে ইচ্ছা করে না, এটা একটু বিরক্তিকর লাগে, তাই না?"
ধাপ ২: সমাধান দেওয়ার তাড়াহুড়ো করবেন না
এটাই সবচেয়ে কঠিন অংশ। শিশু বোর বলার সাথে সাথে আপনি সাত-আটটা আইডিয়া দিয়ে দিলে সে ধরে নেবে, বোর হলে মা সব ঠিক করে দেবে। ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। সে ঘুরবে, বিরক্ত হবে, তারপর হঠাৎ কিছু একটা তুলে নেবে। এই মুহূর্তটার জন্যই আমরা অপেক্ষা করছি।
ধাপ ৩: একটি "বোরডম জার" বানান
কাচের বয়াম, কৌটো বা কাগজের বাক্স নিন। ছোট ছোট কাগজের টুকরোয় একটা করে কাজ লিখুন বা ছবি আঁকুন (যারা এখনো পড়তে পারে না তাদের জন্য ছবি)। শিশু বোর বললে বলুন, "জার থেকে একটা কাগজ তুলে নাও।" সিদ্ধান্তটা তার হাতে, আর আপনি শুধু সুযোগ সাজিয়েছেন। বানানোর কাজটা একসাথে করুন, এতে সে জারটাকে নিজের মনে করবে।
জারে রাখার মতো ঘরোয়া আইডিয়া:
- পুরোনো কাপড় দিয়ে একটা তাঁবু বানাও।
- কাগজের নৌকা বানিয়ে বালতির পানিতে ভাসাও।
- তোমার প্রিয় খেলনার জন্য একটা বাড়ি বানাও।
- রান্নাঘর থেকে পাঁচটা জিনিস খুঁজে এনে তাদের নিয়ে গল্প বলো।
- মা বা বাবার সাথে একটা ছোট নাটক করো।
- জানালার বাইরে যা দেখো তার ছবি আঁকো।
- কাগজ ছিঁড়ে বা কেটে কোলাজ বানাও।
- ঘরের মধ্যে "মেঝে লাভা" খেলা খেলো (বালিশ আর কুশনের ওপর দিয়ে হাঁটা)।
- গান বানাও, নিজের নামে একটা ছড়া লেখো।
- তিনটি রঙের জিনিস খুঁজে এনে সাজাও।
- মাটিতে বা আটার খেলনা বানাও।
- পুরোনো জুতোর বাক্সে ছোট্ট একটা বাগান সাজাও।
ধাপ ৪: অফলাইন কাজের একটি সাজানো কোণ রাখুন
বাসার এমন একটা জায়গা ঠিক করুন যেখানে সহজে হাতের কাছে পাওয়া যায়: রঙিন পেন্সিল, সাদা কাগজ, আঠা, কাঁচি (বড়দের নজরে), ব্লক, পুরোনো ম্যাগাজিন, কাপড়ের টুকরো, ছোট বাক্স। দামি খেলনা লাগে না। সাধারণ জিনিসই শিশুর কল্পনায় যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে।
ধাপ ৫: স্ক্রিন বন্ধের সময়টা আগে থেকে জানান
হঠাৎ মোবাইল সরিয়ে নিলে অস্থিরতা বাড়ে। আগেই বলুন: "পাঁচ মিনিট পর মোবাইল বন্ধ হবে, তারপর আমরা জার থেকে একটা কাজ তুলব।" পরিবর্তনের জন্য মনকে প্রস্তুত করা গেলে কান্নাকাটি কমে। আমি আগেই এই "পাঁচ মিনিট আগে জানানোর" কৌশল নিয়ে আলাদা একটি লেখা লিখেছি, সেটি দেখে নিতে পারেন।
ধাপ ৬: প্রথম দিকে নিজে একটু যুক্ত হোন
বোরডমের সময় শিশুকে একেবারে একা ছেড়ে দিতে বলছি না। প্রথম সপ্তাহে ৫-১০ মিনিট নিজে খেলায় যোগ দিন, তারপর আস্তে আস্তে সরে আসুন। শিশু একবার খেলায় ডুবে গেলে আপনার দরকার কমে যাবে।
নমুনা কথোপকথন
শিশু যখন প্রথম বলে 'বোর হচ্ছি': "হুম, বুঝলাম। বোর লাগাটা ভালো লাগে না। তুমি একটু ভাবো তো, আজ কী করা যায়? আমি কাজ শেষ করে ১০ মিনিট পর আসছি, দেখব তুমি কী বের করলে।"
শিশু যখন বলে 'আমার কিছু করার নেই': "তাহলে চলো আমাদের বোরডম জারটা খুলি। তুমি একটা কাগজ তুলে নাও, দেখি কী আছে।"
শিশু যখন জার থেকে তুলেও বলে 'এটা ভালো লাগছে না': "ঠিক আছে, আরেকটা তুলতে পারো। বা নিজের মতো নতুন কিছু ভাবতে পারো। আমি জানি, তুমি ভালো আইডিয়া বের করতে পারো।"
শিশু কেঁদে উঠলে ও মোবাইল চাইলে: "আমি বুঝতে পারছি তুমি মোবাইল চাও, আর সেটা না পেয়ে খারাপ লাগছে। এখন মোবাইলের সময় নয়। চাইলে আমাকে একটা বড় আলিঙ্গন দিতে পারো, তারপর একসাথে কিছু বানাই।"
যখন সে নিজে কিছু বানাতে পারে: "তুমি নিজে এই বাড়িটা বানিয়েছ! আমাকে বলো তো, এর ভেতরে কে থাকে?" (এখানে প্রশংসা হোক চেষ্টার, "কী সুন্দর" বলার চেয়ে প্রশ্ন বেশি কাজের)
অফলাইন কাজের তালিকা: বয়স অনুযায়ী
৩-৪ বছর:
- ব্লক সাজানো, মাটির ডো দিয়ে খেলা।
- সাবান-পানিতে খেলনা ধোয়ার খেলা।
- ছবির বই দেখে গল্প বানানো।
- রান্নাঘরে কাঠের চামচ আর বাটি দিয়ে বাজনা।
৫-৬ বছর:
- ছবি আঁকা, কাগজ কেটে সাজানো।
- পুতুল বা খেলনা নিয়ে নাটক।
- ছাদে বা বারান্দায় গাছের পাতা সংগ্রহ।
- সহজ ধাঁধা বা ম্যাচিং খেলা।
৭-৮ বছর:
- ছোট গল্প লেখা বা আঁকা।
- কার্ডবোর্ড দিয়ে বাড়ি বা গাড়ি বানানো।
- নিজের একটি "দোকান" সাজিয়ে খেলা।
- বাগানে বা টবে বীজ লাগানো ও দেখভাল।
- বোর্ড গেম, লুডু, বা সাপ-লুডু পরিবারের সাথে।
যা করবেন না
- বোর বলার সাথে সাথে মোবাইল ধরিয়ে দেবেন না। তাহলে সে শিখবে, বোর হলে মোবাইল পাওয়া যায়।
- "তুমি এত অকর্মা কেন?" ধরনের কথা বলবেন না।
- সারাদিনের প্রতিটি মুহূর্ত কোচিং, ক্লাস আর কাজে ভরে দেবেন না। শিশুর ফাঁকা সময়ও দরকার।
- শিশুকে একা খেলতে দিয়ে বারবার পরীক্ষা করবেন না, "হয়েছে? কী বানালে?" বললে তার মনোযোগ ভাঙে।
- অন্য শিশুর সাথে তুলনা করবেন না।
- বোরডমকে শাস্তি বানাবেন না, যেমন "বোর হচ্ছ? তাহলে ঘর পরিষ্কার করো।" তাহলে সে বোর কথাটাই লুকাতে শুরু করবে।
মায়ের জন্য ছোট্ট একটা মনে রাখার কথা
আমরা মায়েরা প্রায়ই নিজেকে দোষ দিই: "আমি ওকে ব্যস্ত রাখতে পারছি না।" কিন্তু আপনার কাজ শিশুকে ২৪ ঘণ্টা বিনোদন দেওয়া নয়। আপনার কাজ হলো তাকে এমন মানুষ হতে সাহায্য করা, যে নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে জানে। আর এটা একদিনে শেখা যায় না। কিছু দিন ধৈর্য ধরুন, সে-ই একদিন বলবে, "মা, দেখো আমি কী বানিয়েছি!"
সেই দিনের জন্য আজকের এই কয়েক মিনিটের অস্বস্তি সহ্য করা সার্থক।
সাধারণ প্রশ্ন
বাচ্চা এক মিনিটও একা থাকতে পারে না, কী করব?
ছোট করে শুরু করুন। প্রথমে ৫ মিনিট পাশে বসে খেলুন, তারপর ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়ান। প্রতিদিন একই সময়ে একটি "নিজের খেলার সময়" ঠিক করলে অভ্যাস তৈরি হয়। বাচ্চা যতটুকু একা খেলবে, সেটুকুই প্রশংসা করুন।
বোরডম জার কাজ না করলে কী করব?
জারের কাজগুলো হয়তো শিশুর বয়স বা আগ্রহের সাথে মিলছে না। শিশুকে নিয়ে নতুন করে আইডিয়া লিখুন, সে যা পছন্দ করে তা-ই রাখুন। আর জারের কাজ পুরোনো হয়ে গেলে মাসে একবার বদলে দিন।
বোর হলে মাঝেমধ্যে কার্টুন দিলে কি সব নষ্ট হবে?
না। কখনো কখনো ক্লান্ত দিনে একটু স্ক্রিন সময় দেওয়া স্বাভাবিক, আর সেটা নিয়ে অপরাধবোধে ভোগার দরকার নেই। চেষ্টা করুন, স্ক্রিন যেন বোরডমের একমাত্র সমাধান না হয়।
বোর হওয়ার সাথে মন খারাপ বা চুপচাপ থাকা মিলে গেলে কী করব?
যদি দেখেন শিশু অনেকদিন ধরে খেলায় আগ্রহ হারিয়েছে, খুব চুপচাপ বা সবসময় মনমরা, তাহলে এটা শুধু একঘেয়েমি নাও হতে পারে। শিশুর সাথে খোলাখুলি কথা বলুন, আর দরকার মনে হলে শিশু চিকিৎসক বা শিশুমনোবিদের সাথে কথা বলুন।
🎈 মিস পিয়ার মূল কথা: "বোর হওয়া শিশুর ক্ষতি নয়, বরং কল্পনার দরজা। পর্দা বন্ধ হলে যে ফাঁকা সময়টা তৈরি হয়, সেখানেই জন্ম নেয় নতুন খেলা, নতুন গল্প। আপনি শুধু একটু সাহস করে অপেক্ষা করুন।"
আরও পড়ুন
- অনলাইন ক্লাস আর হোমওয়ার্কের স্ক্রিন বনাম বিনোদনের স্ক্রিন: আলাদা করার সহজ উপায়
- বাবা-মায়ের মোবাইল দেখে বাচ্চা স্ক্রিন চায় কেন?
- শিশুকে সাথে নিয়ে স্ক্রিন দেখার উপকার: কো-ভিউইং আর কথোপকথনের প্রশ্নের তালিকা
- ফ্যামিলি মিডিয়া প্ল্যান: স্ক্রিন নিয়ে ঘরের নিয়ম-চার্ট কীভাবে বানাবেন (নমুনাসহ)
- স্ক্রিন টাইম রিওয়ার্ড বা ঘুষ হিসেবে দেওয়া কেন ভুল? 'পড়লে মোবাইল' নিয়মের বিকল্প