দাদা-দাদি, নানা-নানি মোবাইল দিয়ে খাওয়ান? পরিবারের সবাইকে বোঝানোর উপায়

স্ক্রিন টাইম · 2026-10-08

"আমি সারা সপ্তাহ মোবাইল ছাড়া খাওয়াই। আর নানুবাড়ি গেলেই নানু ইউটিউব ছেড়ে দিয়ে বলেন, 'আহা, খাক না, পেটে তো কিছু যাচ্ছে!' তিন দিনে আমার সব পরিশ্রম শেষ।"

এই কথাটা আমি এত মায়ের মুখে শুনেছি যে গুনে শেষ করা যাবে না। আর প্রতিবারই মায়ের গলায় একটা মিশ্র অনুভূতি থাকে: রাগ, অসহায়তা, আর একটু অপরাধবোধও, কারণ যিনি নিয়ম ভাঙছেন তিনি তো আমাদের নিজেদেরই আপনজন।

দ্রুত উত্তর: দাদা-দাদি, নানা-নানিকে দোষ না দিয়ে আগে তাঁদের ভালোবাসাটা স্বীকার করুন। তারপর "মোবাইল দেবেন না" না বলে বলুন "আপনি কী করতে পারেন", যেমন গল্প বলা বা ছড়া শোনানো। পরিবারের সবার জন্য ৩-৪টি সহজ, একই নিয়ম ঠিক করে নিলে শিশু বিভ্রান্ত হয় না।

কেন দাদা-দাদি, নানা-নানি এমন করেন?

প্রথমেই একটা কথা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার: তাঁরা ক্ষতি করতে চান না। তাঁদের কাছে এর পেছনের কারণগুলো অন্যরকম।

  • তাঁদের সময়ে খাওয়ানোই ছিল সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। একটু শুকনো বাচ্চা দেখলেই "ঠিকমতো খাচ্ছে না" ভাবনাটা তাঁদের ভেতরে গভীরভাবে বসা। পেটে খাবার গেলেই তাঁরা স্বস্তি পান।
  • তাঁরা নাতি-নাতনির কান্না সহ্য করতে পারেন না। আদর করে সব কিছু মিটিয়ে দিতে চান, কারণ দায়িত্বটা এখন মা-বাবার, তাই তাঁরা নিজেদের ভালোবাসাটাই বেশি দেখান।
  • তাঁরা জানেন না কার্টুনের গতি বা পর্দার অভ্যাস নিয়ে নতুন করে কী ভাবা হচ্ছে। আমাদের শৈশবে এই বিষয়টাই ছিল না।
  • মোবাইল তাঁদের কাছে সহজ সমাধান। একজন বয়স্ক মানুষের শরীর ক্লান্ত থাকে। দুরন্ত শিশুকে একজায়গায় বসাতে মোবাইলই সবচেয়ে সহজ উপায় মনে হয়।

এই কারণগুলো বুঝলে আপনার রাগ অনেক কমে যাবে, আর কথা বলার সুরও নরম হবে। আর সুর নরম হলেই কাজ হয়।

শিশুর জন্য কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ?

আমি শিক্ষিকা, চিকিৎসক নই। তাই বড় বড় দাবি করব না। তবে ঘরে ঘরে যা দেখি, তা বলতে পারি।

যে শিশু খাওয়ার সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে, সে প্রায়ই খাবারের স্বাদ, গন্ধ বা পেট ভরার অনুভূতিতে মন দেয় না। আর বাসায় একজন নিয়ম মানলে, আরেকজন না মানলে শিশু খুব দ্রুত বুঝে ফেলে, "ওহ, নানুর কাছে গেলে হবে।" এতে নিয়মের ওপর তার আস্থা কমে, জেদ বাড়ে, আর মা-বাবার কথার মূল্যও কমে যায়।

সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় অন্য জায়গায়। দাদা-দাদি, নানা-নানি শিশুর জীবনে গল্প, ছড়া, পুরোনো দিনের কথা আর উষ্ণ কোলের সবচেয়ে বড় উৎস। মোবাইল সেই সময়টা দখল করে নিলে শিশু ও প্রবীণ দুজনেই একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ার সুযোগ হারান। বিষয়টা শুধু "স্ক্রিন খারাপ" নয়, বরং "আপনারা একসাথে যে সময়টা পেতে পারতেন, সেটা মোবাইল নিয়ে নিচ্ছে।"

খাওয়ার সময় মোবাইল ছাড়ার বিস্তারিত রুটিন নিয়ে আমি আগেই আলাদা একটা লেখায় বলেছি। এখানে মূল আলোচনা হলো, সেই নিয়ম পরিবারের বড়দের কীভাবে বোঝাবেন।

ধাপে ধাপে পরিকল্পনা

ধাপ ১: নিজের মন আগে শান্ত করুন

রাগের মাথায় বা বাচ্চার সামনে দাদু-নানুকে কিছু বলবেন না। সেটা সবচেয়ে খারাপ সময়। আগে মনে মনে ঠিক করুন, আপনি জিততে চান না, আপনি শুধু শিশুর ভালো চান।

ধাপ ২: আলাদা, শান্ত সময়ে কথা বলুন

চা খাওয়ার সময়, বা রাতে বাচ্চা ঘুমানোর পর, বা ফোনে নির্জনে। ভিড়ের মধ্যে বা অন্যদের সামনে বললে বয়স্ক মানুষ অপমানিত বোধ করতে পারেন। কথা শুরু করুন তাঁদের প্রশংসা দিয়ে।

ধাপ ৩: "আপনি ভুল করছেন" নয়, "আমি এমন চেষ্টা করছি" বলুন

"আমি" দিয়ে শুরু করা বাক্য অনেক নরম শোনায়। "আপনি মোবাইল দেন কেন?" বললে প্রতিরক্ষা শুরু হয়। "আমি চেষ্টা করছি খাওয়ার সময় মোবাইল ছাড়া রাখতে" বললে তাঁরা শুনতে প্রস্তুত থাকেন।

ধাপ ৪: তাঁদের হাতে একটা নতুন ভূমিকা দিন

শুধু "করবেন না" বললে তাঁদের হাত খালি থাকে। খালি হাতে তাঁরা পুরোনো পথেই ফিরে যাবেন। তাই বলুন কী করতে পারেন:

  • খাওয়ার সময় একটা ছোট গল্প বলা, যেমন শেয়াল আর কাকের গল্প।
  • পুরোনো দিনের ছড়া বা গান শোনানো।
  • পাশে বসে শিশুকে নিজের হাতে খেতে উৎসাহ দেওয়া।
  • জানালার বাইরে পাখি বা গাছ দেখানো।
  • নিজের ছোটবেলার খাবারের গল্প শোনানো।

গল্প বলার ভূমিকা পেলে দাদু-নানুরা নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, আর সেটাই আসল চাবিকাঠি।

ধাপ ৫: পরিবারের জন্য ৩-৪টি ছোট নিয়ম ঠিক করুন

নিয়ম যত কম, মানা তত সহজ। নমুনা:

  1. খাবার টেবিলে বা মাদুরে কারও হাতে মোবাইল থাকবে না, বড়দেরও না।
  2. ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে শিশুর জন্য স্ক্রিন বন্ধ।
  3. কান্না থামাতে মোবাইল দেওয়া হবে না। কান্না হলে কোলে নেওয়া, গল্প বা গান।
  4. স্ক্রিন দেখলে দিনে নির্দিষ্ট একটা সময়ে, সবার জানা মতো, সীমিত সময়ের জন্য।

নিয়মগুলো কাগজে লিখে ফ্রিজে বা দেয়ালে লাগিয়ে রাখতে পারেন। লেখা নিয়ম ব্যক্তিগত অভিযোগের মতো শোনায় না, এটা যেন "বাসার নিয়ম"।

ধাপ ৬: প্রথম দু-এক সপ্তাহ ধৈর্য ধরুন

পুরোনো অভ্যাস একদিনে যাবে না। একদিন ভুল হবে, আবার মনে করিয়ে দিন। প্রতিবার নরম গলায়, হাসিমুখে। আর যেদিন তাঁরা নিয়ম মানবেন, সেদিন মন খুলে ধন্যবাদ দিন। প্রশংসা প্রবীণদের কাছেও ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

নমুনা কথোপকথন: কী বলবেন

নানুকে (নানু যদি মোবাইল দিয়ে খাওয়ান): "আম্মা, আপনি যে আমার মেয়েটাকে এত যত্ন করে খাওয়ান, আমি জানি ও আপনার জান। আমি একটা নতুন চেষ্টা করছি, খাওয়ার সময় মোবাইল ছাড়া রাখার। আপনি যদি পাশে বসে ওকে একটা গল্প শোনান, আমার খুব উপকার হয়। আপনার গল্প তো ও ভীষণ ভালোবাসে।"

দাদুকে (যিনি বলেন, 'আমরা তো এভাবেই বড় হয়েছি'): "আব্বা, ঠিক বলেছেন, আপনারা মোবাইল ছাড়াই বড় হয়েছেন, আর আপনাদের মতো শক্ত মানুষ হয়েছেন। আমিও চাই ও তেমনই বড় হোক। তাই ওকে একটু বেশি গল্প আর মাঠে খেলার সুযোগ দিতে চাই।"

শ্বশুর-শাশুড়িকে, যখন সম্পর্কটা একটু সংবেদনশীল: "আম্মা, আমি আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। এই বিষয়ে আমি একটু অন্যরকম চেষ্টা করছি, আর আপনার সাহায্য ছাড়া হবে না। আপনি পাশে থাকলে ও ঠিকঠাক শিখবে।"

যখন তাঁরা ভুলে মোবাইল দিয়ে ফেলেন: সামনে শিশুর মুখে কিছু বলবেন না। পরে আলাদা করে হালকা সুরে বলুন: "আম্মা, ও আজ মোবাইল দেখে খেয়েছে, তাই রাতে ক্ষুধা পায়নি। কাল আমরা গল্প দিয়ে চেষ্টা করি?"

শিশুকে (দাদু-নানুর বাসায় যাওয়ার আগে): "আমরা নানুবাড়ি যাচ্ছি। সেখানে খাওয়ার সময় মোবাইল ঘুমায়, আর নানু আমাদের নতুন গল্প শোনাবেন। তুমি কোন গল্পটা শুনতে চাও?"

বাস্তবে কী কী বাধা আসতে পারে?

  • "তুমি বেশি কড়া হচ্ছ।" শান্তভাবে বলুন, "আমি কড়া হতে চাই না, শুধু ওকে গল্প বলে খেতে শেখাতে চাই।"
  • "একদিন দিলে কী হয়?" সত্যি কথা হলো, একদিনে বড় ক্ষতি হয় না। সমস্যা হলো নিয়মিত হয়ে যাওয়া। তাই বলুন, "এক-আধদিন ঠিক আছে, তবে রোজ না হলেই ভালো।"
  • শিশু কেঁদে ফেললে দাদু-নানু গলে যান। আগে থেকেই বলে রাখুন, "প্রথম দু-তিন দিন ও একটু কাঁদবে, আপনি পাশে থেকে সামলাবেন, আমি আছি।"
  • দাদা-দাদি দূরে থাকেন, ভিডিও কলে কথা হয়। ভিডিও কল স্ক্রিন টাইম হলেও এটি সম্পর্কের জন্য ভালো। একসাথে ছড়া বলা, গল্প শোনা বা আঙুলের খেলায় ব্যবহার করুন। শুধু খাওয়ার সময় চালিয়ে রাখবেন না।

যা করবেন না

  • সবার সামনে দাদু-নানুকে সংশোধন করবেন না।
  • শিশুর সামনে বড়দের নিয়ে অভিযোগ করবেন না। এতে শিশু দুই পক্ষের মাঝখানে পড়ে যায়।
  • "আপনারা তো বোঝেন না" বা "আপনাদের সময় আলাদা ছিল" ধরনের কথা বলবেন না।
  • মোবাইল লুকিয়ে বা ধমক দিয়ে সরাবেন না। আলোচনা দিয়েই কাজ হয়।
  • নিজের হাতে মোবাইল ধরে রেখে অন্যকে নিয়ম মানতে বলবেন না। আগে নিজে উদাহরণ হন।
  • প্রতিদিন অভিযোগ বা মনে করানো একঘেয়ে বকুনি বানিয়ে ফেলবেন না। একবার ভালো করে বলুন, তারপর ছোট ছোট প্রশংসা করুন।

ছোট কিছু বাড়তি কৌশল

একটি "গল্পের ঝুড়ি" বানান। একটা ঝুড়িতে কয়েকটা ছবির বই, পুরোনো ছড়ার বই বা পুতুল রাখুন। দাদু-নানু এলে ঝুড়িটা সামনে রাখুন। তাঁদের হাতের কাছে বিকল্প থাকলে মোবাইল খোঁজার প্রয়োজন কমে যায়।

একসাথে রান্নার ঘরে ডাকুন। দাদি বা নানি যদি রান্না করেন, শিশুকে পাশে বসিয়ে মটরশুঁটি ছাড়াতে বা সবজি ধুতে দিন। এটা শিশুর জন্য খেলাও, শেখাও, আর প্রবীণের জন্য সঙ্গও।

ছবি তুলে রাখুন। নাতি-নাতনির সাথে গল্প বলার ছবি পরিবারের গ্রুপে পাঠান। দেখবেন, তাঁরা গর্বে আরও উৎসাহী হয়ে উঠবেন।

সম্মানের ভাষা বজায় রাখুন। আপনি কথা বলছেন সেই মানুষটির সাথে, যিনি আপনার স্বামী বা স্ত্রীকে বড় করেছেন, বা আপনাকেই বড় করেছেন। এই কৃতজ্ঞতা কণ্ঠে থাকলে তাঁরা বোঝেন, আপনি আক্রমণ করছেন না, সহযোগিতা চাইছেন।

সাধারণ প্রশ্ন

দাদু-নানু কিছুতেই না মানলে কী করব? প্রথমে বুঝুন তাঁদের ভয়টা কোথায়। অনেক সময় ভয় থাকে "ও না খেলে কী হবে"। সেই ভয় কমাতে নিজের চেষ্টার ফলাফল দেখান, দু-তিন দিনের খাওয়ার রুটিন দেখান। তবুও না মানলে আপনার বাসায় আপনার নিয়ম, আর তাঁদের বাসায় যতটা সম্ভব ছোট ছাড়, এভাবে মধ্যপথ বের করুন। বাচ্চা বুঝবে, জায়গা অনুযায়ী নিয়ম বদলায়, কিন্তু ভালোবাসা বদলায় না।

স্বামী বা স্ত্রীর পরিবারের সাথে কথা বলতে ভয় লাগে, কী করব? আপনার সঙ্গীকে সাথে নিন। নিজের বাবা-মাকে বোঝানোর কাজটা তিনি সবচেয়ে ভালো পারবেন। দুজন মিলে একই কথা বললে পরিবার সেটাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে না নিয়ে সিদ্ধান্ত হিসেবে নেয়।

ছোট বাচ্চা মোবাইল ছাড়া একদম খেতে চায় না, তখন কী করব? প্রথম কয়েকদিন কঠিন হবে। এটা স্বাভাবিক। অল্প পরিমাণে খাবার দিন, গল্প বা ছড়া দিয়ে মন টানুন, আর ক্ষুধা পাওয়া পর্যন্ত জোর করবেন না। যদি ওজন কমে বা খুব দুর্বল লাগে, শিশু চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।

ভিডিও কলে দাদা-দাদির সাথে কথা বলাও কি খারাপ? না। সম্পর্ক ধরে রাখতে ভিডিও কল খুব ভালো। শুধু খাওয়ার সময় বা ঘুমানোর ঠিক আগে না করাই ভালো, আর কল চলাকালে বড়রা কথা বলে, গান গেয়ে বা ছড়া বলে শিশুকে যুক্ত রাখুন।


🌿 মিস পিয়ার মূল কথা: "দাদু-নানুকে নিয়মের শত্রু নয়, নিয়মের সবচেয়ে মূল্যবান সঙ্গী বানান। তাঁদের হাতে মোবাইলের বদলে একটা গল্প তুলে দিন। দেখবেন, শিশুও খুশি, আপনিও নিশ্চিন্ত, আর তাঁদের ভালোবাসাও আরও গভীর হয়েছে।"

আরও পড়ুন