বাচ্চা অন্যের জিনিস কেড়ে নেয় কেন? আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-Regulation) শেখানোর খেলা
খেলায় শেখা · 2026-10-08
"পার্কে গেলেই আমার ছেলে অন্য বাচ্চার হাত থেকে খেলনা কেড়ে নেয়। অন্য মায়েরা আমার দিকে তাকান, আমি লজ্জায় পড়ি।" "ওকে বোঝাই, কিন্তু পরের মুহূর্তেই আবার একই কাণ্ড!"
আপনি একা নন। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সে খেলনা কেড়ে নেওয়া প্রায় প্রতিটি শিশুর জীবনেই একবার না একবার আসে। আজ আমরা দেখব, কেন এমন হয় আর কীভাবে খেলার ছলে শিশুকে আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানো যায়। আত্মনিয়ন্ত্রণ মানে নিজের ইচ্ছা, আবেগ আর শরীরকে সময়মতো থামাতে পারার ক্ষমতা।
দ্রুত উত্তর: দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সে খেলনা কেড়ে নেওয়া স্বাভাবিক, কারণ ইচ্ছা আর কাজের মাঝে থেমে ভাবার ক্ষমতা তখনো গড়ে ওঠেনি। ঘটনার সময় শান্ত থাকুন, খেলনা ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করুন, আর ফ্রিজ ডান্স, লাল বাতি-সবুজ বাতির মতো খেলা দিয়ে অপেক্ষা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অভ্যাস করান।
শিশু কেন কেড়ে নেয়?
বড়দের কাছে এটা অভদ্রতা মনে হতে পারে, কিন্তু শিশুর দৃষ্টিতে ব্যাপারটা ভিন্ন:
- ইচ্ছা আর কাজের মাঝের ফাঁক নেই: "আমি চাই" মনে আসামাত্র হাত এগিয়ে যায়। থেমে ভাবার ক্ষমতা তখনো গড়ে ওঠেনি।
- অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা বিকশিত হচ্ছে: "ওর কেমন লাগবে" এই ভাবনা ধীরে ধীরে আসে।
- ভাষার অভাব: "আমি একটু নিতে পারি?" বলার শব্দ বা সাহস নেই।
- "আমার" বোধ: দুই-তিন বছর বয়সে মালিকানা নিয়ে ধারণা প্রবল হয়।
- অনুকরণ: কখনো কখনো বড় ভাই-বোন বা অন্যদের দেখেও শেখে।
তাই কেড়ে নেওয়াটা চরিত্রের দোষ নয়। এটা প্রশিক্ষণযোগ্য একটা দক্ষতার অভাব।
ঘটনার সময় কী বলবেন?
খেলার আগে ঘটনার মুহূর্তটা সামলানো শিখে নিন:
- শান্তভাবে কাছে যান, খেলনাটা দুজনের মাঝখানে ধরে রাখুন।
- বলুন: "আমি দেখছি তুমি খেলনাটা চাইছ। কিন্তু সাবিহা এখন এটা নিয়ে খেলছে। তার হাত থেকে কেড়ে নিলে সে কষ্ট পায়।"
- বিকল্প দিন: "চাইলে বলো, আমাকে একটু দেবে? অথবা অপেক্ষা করো, আমরা একটা টাইমার দিই।"
- সাবিহাকে আগে সান্ত্বনা দিন এবং প্রয়োজনে খেলনা ফিরিয়ে দিন।
কেড়ে নেওয়া শিশুকে খেলনা দিয়ে "শান্ত" করবেন না। এতে শেখে, কেড়ে নিলে কাজ হয়।
আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানোর ৬টি খেলা
এই খেলাগুলো দৈনিক ৫–১০ মিনিট খেললেই যথেষ্ট। খেলাই শিশুর সবচেয়ে বড় শিক্ষক।
১. পুতুলের মতো স্থির (Freeze Dance)
গান চালান, শিশু নাচবে। গান থামলে ছবির মতো স্থির। এতে "থামার" অনুশীলন হয়। শুরুতে ১০ সেকেন্ড, পরে বাড়ান।
২. লাল বাতি, সবুজ বাতি
আপনি "সবুজ" বললে সে হাঁটবে বা দৌড়াবে, "লাল" বললে থামবে। উল্টো করে খেলুন, শিশুকে নেতা বানান। নিয়ম মানা আর নিয়ম দেওয়া দুটোই শেখা হয়।
৩. ধীর গতির প্রতিযোগিতা (Slow Motion Race)
সবচেয়ে ধীরে যে হাঁটে সে জেতে! তাড়াহুড়োর আবেগ সামলানো শেখার চমৎকার উপায়। হাসতে হাসতে ধীর হতে শেখে।
৪. সাইমন সেজ (শিক্ষক বলেছেন)
"মা বলেছেন হাত তোলো" হলে তুলবে, শুধু "হাত তোলো" বললে তুলবে না। মনোযোগ আর আবেগ সংযমের দারুণ চর্চা।
৫. পালা করে ব্লক সাজানো
একটি ব্লক আপনি, একটি সে। কে কোথায় ব্লক বসাবে, পালা ধরে। "এখন তোমার পালা", "এখন আমার পালা" শব্দগুলো খেলার মধ্যে বারবার ব্যবহার করুন।
৬. বেলুন শ্বাস (Balloon Breathing)
হাত পেটে রেখে নাক দিয়ে শ্বাস টেনে পেটকে বেলুনের মতো ফোলাতে বলুন, তারপর মুখ দিয়ে ধীরে ছাড়তে। রাগ উঠলে গভীর শ্বাসের এই কৌশলটা কাজে লাগে। প্রথমে খেলার ছলে শান্ত অবস্থায় শেখান।
দৈনন্দিন জীবনে অপেক্ষা শেখানোর টিপস
- টাইমার ব্যবহার করুন: বালু ঘড়ি বা বাজার টাইমার দেখিয়ে "পালা" নিয়ম করুন। শিশু অপেক্ষার সীমা দেখতে পায়।
- ছোট অপেক্ষা দিয়ে শুরু: প্রথমে ৩০ সেকেন্ড, পরে এক মিনিট। সফল হলে প্রশংসা।
- অপেক্ষার সময় কিছু করার ব্যবস্থা: গান গাওয়া, গোনা, শ্বাস নেওয়া।
- রোল প্লে: পুতুল দিয়ে অভিনয় করুন। এক পুতুল কেড়ে নিল, আরেক পুতুল কাঁদল। "এখন কী করা উচিত?" শিশুকে সমাধান বের করতে দিন।
- প্রশংসায় নির্দিষ্ট হোন: "আজ তুমি অপেক্ষা করেছ। আমি দেখেছি, খুব ভালো লেগেছে।"
নমুনা সংলাপ
পার্কে ঝিনুক অন্য শিশুর বালতি কেড়ে নিল।
আপনি: "ঝিনুক, বালতিটা আরিয়ানের। ওর কষ্ট হয়েছে। এসো, আমরা ফেরত দিই।"
ঝিনুক কান্না শুরু করলে: "তুমিও বালতিটা চেয়েছিলে, তাই না? কেড়ে নিলে অন্যের কষ্ট হয়। বলো, আমি কি একটু নিতে পারি?"
যদি আরিয়ান না দেয়: "আরিয়ান এখন খেলছে। আমরা অপেক্ষা করব। চলো, তুমি এই বেলচা দিয়ে গর্ত খোঁড়ো।"
এখানে আপনি শিশুকে শেখাচ্ছেন, চাওয়া যায়, কিন্তু অন্যজন "না" বলতেও পারে। এটাই সামাজিক জীবনের বড় পাঠ।
যা করবেন না
- সবার সামনে "লোভী" বা "অসভ্য" বলে ডাকবেন না।
- জোর করে খেলনা ভাগ করাবেন না। নিজের পালা শেষ হলে স্বেচ্ছায় দেওয়া অনেক বেশি ফলপ্রসূ।
- বদলা হিসেবে শিশুর খেলনা কেড়ে নেবেন না।
- একই ঘটনার জন্য ঘণ্টাখানেক বকাবকি করবেন না।
- ছোট শিশুর কাছ থেকে প্রাপ্তবয়স্কের মতো ধৈর্য আশা করবেন না।
কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন
এই বয়সে কেড়ে নেওয়া স্বাভাবিক, আর সাধারণত চার-পাঁচ বছরের মধ্যে কমে আসে। যদি আচরণ ছয় বছরের পরেও খুব ঘন ঘন চলে, সঙ্গে প্রচণ্ড রাগ, মারধর বা বন্ধুদের সাথে একেবারেই খেলতে না পারা থাকে, অথবা কথা ও সামাজিক বিকাশ নিয়ে আপনার অন্য উদ্বেগ থাকে, তবে শিশু চিকিৎসক বা শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। এটা রোগনির্ণয় নয়, শুধু পরামর্শ নেওয়ার প্রস্তাব।
সাধারণ প্রশ্ন
ওর খেলনা কেউ নিলে ও কেঁদে ফেলে, অথচ নিজে অন্যেরটা কেড়ে নেয়। কেন?
কারণ নিজের কষ্ট সে বোঝে, কিন্তু অন্যের কষ্টের সাথে নিজের কাজের সংযোগটা এখনো গড়ে উঠছে। রোল প্লে এ ব্যাপারে সাহায্য করে।
সব খেলনা বাসায় থাকলে কি সমস্যা কমবে?
কিছু খেলনা "আমার", কিছু "সবার", এভাবে ভাগ করুন। অতিথি এলে "আমার" খেলনা আগেই সরিয়ে রাখা যেতে পারে।
কতদিনে ফল পাব?
শিশু ভেদে আলাদা। সপ্তাহে কয়েকদিন ধারাবাহিকভাবে খেললে কয়েক সপ্তাহে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
বন্ধুদের সাথে খেলা বন্ধ করে দেব?
না। বন্ধুদের সাথে খেলার মধ্য দিয়েই এই দক্ষতা তৈরি হয়। আপনি পাশে থেকে সাহায্য করুন।
🧩 মিস পিয়ার মূল কথা: "কেড়ে নেওয়া মানে শিশুর থামার ব্রেক এখনো তৈরি হচ্ছে। শাস্তি নয়, খেলা দিয়ে সেই ব্রেক শক্ত করুন। প্রতিদিনের ছোট ছোট খেলাই আত্মনিয়ন্ত্রণের বড় ভিত্তি।"
আরও পড়ুন
- ঘরে বসে বর্জ্য জিনিস দিয়ে শিশুর জন্য সায়েন্স ও সেন্সরি লার্নিং টয় বানানোর উপায়
- ই-ঈ, উ-ঊ, ণ-ন, শ-ষ-স: বাংলা বানান ভুল নিয়ে শিশুকে চাপ না দিয়ে শেখানোর উপায়
- স্ক্রিন বন্ধ করলে বাচ্চা বোরড হয়? 'আমি বোর হচ্ছি' কথার ইতিবাচক উত্তর
- কোকমেলন ও ফাস্ট-পেসড কার্টুন বাচ্চাকে কেন অস্থির করে তোলে?
- ডোপামিন ডিটক্স: একটানা স্ক্রিন দেখা শিশুর মেজাজ কেন খিটখিটে করে দেয়