অন্যের চোখে চোখ রেখে কথা বলা: লাজুক শিশুর সামাজিক সংকোচ কাটানোর সহজ খেলা
প্যারেন্টিং · 2026-10-06
"কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেই মাটির দিকে তাকায়, নয়তো মায়ের আঁচলের পেছনে মুখ লুকায়!"
অনেক মা-বাবা এতে লজ্জা পেয়ে বলেন: "চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলো! নিচে কী দেখছ?"
একটা পরিচিত দৃশ্য বলি। ঈদের দিন দাদাবাড়িতে নতুন জামা পরে ৪ বছরের নুসরাত দাঁড়িয়ে আছে। চাচা হেসে জিজ্ঞেস করলেন, "কী গো মামনি, তোমার নাম কী? কোন ক্লাসে পড়ো?" নুসরাত মায়ের কাপড়ের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে ফেলল। মা ফিসফিস করে বললেন, "বলো, চাচাকে বলো!" চারপাশে সবাই তাকিয়ে, নুসরাতের মুখ আরও লাল হয়ে গেল।
কিন্তু সরাসরি জোর করলে লাজুক শিশুর মনে আরও বেশি ভয় তৈরি হয়। চোখে চোখ রেখে কথা বলা (Eye Contact) কোনো আদেশ দিয়ে শেখানোর বিষয় নয়; এটি হলো অন্তরের আত্মবিশ্বাস ও স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতিফলন।
দ্রুত উত্তর: লাজুক শিশু চোখ এড়িয়ে যায় সাধারণত অস্বস্তি বা সংকোচ থেকে, জেদ থেকে নয়। বকা বা জোর না করে খেলার ছলে অভ্যাস করান, যেমন চোখের রং খোঁজা বা কপালের স্টিকার খেলা, আর নিজে শিশুর সাথে চোখ মেলে কথা বলুন। দীর্ঘদিন চোখ মেলাতে খুব অসুবিধা হলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
লাজুক শিশু কেন চোখ এড়িয়ে যায়?
আমি শিক্ষিকা হিসেবে যা দেখি, তা-ই বলছি। নির্দিষ্ট করে কারণ বলা কঠিন, তবে কয়েকটি কথা প্রায়ই সত্যি হয়:
- স্বভাবগত লাজুকতা। কিছু শিশু জন্ম থেকেই নতুন মানুষকে ধীরে ধীরে চেনে। এটা দোষ নয়, বৈশিষ্ট্য।
- অচেনা পরিবেশ। বড় ভিড়, উচ্চ শব্দ আর অনেক মুখ একসাথে শিশুকে ঘাবড়ে দেয়।
- ভুল করার ভয়। আগে কথা বলে বকা বা হাসির পাত্র হয়ে থাকলে সে নিরাপদ বোধ করে না।
- চাপ। সবার সামনে "বলো বলো" বললে শিশু আরও গুটিয়ে যায়।
- সংস্কৃতির প্রভাব। আমাদের সমাজে অনেক সময় বড়দের চোখের দিকে সরাসরি তাকানো অশোভন বলে শেখানো হয়। তাই শিশু বিভ্রান্ত হতে পারে, কখন তাকাবে, কখন তাকাবে না।
শেষ কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একদিকে বলি "চোখে চোখ রাখো", আবার অন্যদিকে বলি "বড়দের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বোলো না।" শিশুকে একটি পরিষ্কার নিয়ম দিন: "যার সাথে কথা বলছ, তার মুখের দিকে ভদ্রভাবে তাকাও।"
খেলার ছলে কীভাবে শিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলবেন?
১. ‘চোখের রং খোঁজা’ খেলা (The Eye Color Detective)
শিশুকে বলুন:
- "আজকে আমরা গোয়েন্দা খেলা খেলব! তুমি যখনই কারও সাথে কথা বলবে, তোমার মিশন হলো তার চোখের মণিটা কোন রঙের তা গোপনে দেখে নেওয়া!"
- শিশুর কাছে এটি তখন কোনো কঠিন নিয়ম থাকে না, বরং একটি রোমাঞ্চকর খেলায় পরিণত হয়।
- খেলা শেষে জিজ্ঞেস করুন: "বলো তো, দাদুর চোখ কী রঙের? বাবার চোখ কেমন?" উত্তর পেলে হাসিমুখে প্রশংসা করুন।
২. কপালের স্টিকার ম্যাজিক
মা বা বাবা যখন শিশুর সাথে কথা বলবেন:
- নিজের কপালে (দুই চোখের ঠিক মাঝে) একটি ছোট রঙিন হাসিমুখের স্টিকার বা টিপ লাগিয়ে রাখুন।
- শিশুকে বলুন: "আমার স্টিকারটার দিকে তাকিয়ে বলো তো আজ স্কুলে কী খেলেছ?"
- কপালে তাকালে অপর প্রান্তের মানুষটি মনে করে তার চোখের দিকেই তাকানো হচ্ছে, কিন্তু শিশুর ওপর কোনো মানসিক চাপ পড়ে না।
৩. লাজুকতাকে গালি বা লেবেল বানাবেন না
আত্মীয়দের সামনে কখনোই বলবেন না: "ও খুব ভীতু, কারও সামনে কথাই বলতে পারে না!" মা-বাবার এই কথাগুলো শিশুর অবচেতন মনে পরিচয় হয়ে যায়। এর বদলে বলুন: "ও নতুন পরিবেশ একটু দেখে নিচ্ছে, একটু পরেই কথা বলবে।"
৪. নিজে আদর্শ হোন: শিশুর সাথে চোখ মেলান
শিশুরা যা দেখে তা-ই শেখে। দিনের মধ্যে কয়েকবার শিশুর চোখের উচ্চতায় বসে, ফোন সরিয়ে, শুধু তার কথা শুনুন।
- খাওয়ার সময়, ঘুমানোর আগে বা গল্প বলার সময় মুখোমুখি বসুন।
- সে কথা বললে মাথা নাড়ুন, হাসুন, যেন সে বোঝে আপনি তার কথা শুনছেন।
- শিশু চোখ নামিয়ে ফেললেও কিছু বলবেন না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে নিজেই আবার তাকাবে।
৫. ছোট ছোট খেলা: লুকোচুরি ও আয়নার মুখ
চোখে চোখ রাখার চর্চা সহজ খেলায় করা যায়:
- পিক-এ-বু। দুই হাতে মুখ ঢেকে হঠাৎ সরিয়ে বলুন "ভুঁউউ!" ছোট শিশুরা এতে চোখ রেখে হেসে ওঠে।
- আয়নার সামনে মুখ ভেংচি। দুজনে আয়নায় নিজেদের মুখ দেখে মজার ভঙ্গি করুন।
- চোখ পিটপিট খেলা। কে কত দ্রুত চোখ পিটপিট করতে পারে, দেখুন।
- পুতুলের কথা। পুতুলের হয়ে কথা বলান। প্রথমে পুতুলের চোখে, পরে আপনার চোখে তাকিয়ে কথা বলতে উৎসাহ দিন।
সামাজিক পরিস্থিতিতে কী বলবেন
কেউ অতিথি এলে আগেই শিশুকে হালকা প্রস্তুতি দিন। অতিথির সামনে চাপ দেওয়ার চেয়ে এটা অনেক ভালো কাজ করে।
মা (আগে থেকে): "আজ খালামণি আসবেন। তুমি চাইলে হাত নাড়িয়ে 'হ্যালো' বলতে পারো। না চাইলে মায়ের পাশে বসে হাসলেও চলবে।"
শিশু: (চুপ করে মায়ের পাশে সরে যায়)
মা: "ঠিক আছে সোনা, তুমি সময় নাও।" (অতিথির দিকে ফিরে) "ও এখন একটু দেখে নিচ্ছে, একটু পরে কথা বলবে।"
কয়েক মিনিট পর শিশু আগ্রহ দেখালে বলুন: "খালামণির জামার রঙ কী? তুমি কি দেখে বলতে পারবে?" এতে শিশু অতিথির দিকে তাকাতে বাধ্য হয়, কিন্তু চাপ ছাড়া।
যা করবেন না
- সবার সামনে চোখ তুলতে চাপ দেবেন না। "চোখ তোলো, উপরে তাকাও!"
- বকা বা লজ্জা দেবেন না। "কী বোকার মতো করছ।"
- অন্য বাচ্চার সাথে তুলনা করবেন না। "দেখো, ওর বোন কেমন কথা বলে।"
- জোর করে মুখ ঘুরিয়ে দেবেন না। মুখ ধরে সোজা করলে শিশু আতঙ্কিত হয়।
- একটানা তাকিয়ে থাকতে বলবেন না। স্বাভাবিক কথোপকথনে মানুষ কিছুক্ষণ তাকায়, আবার চোখ সরায়।
কখন শিশু বিশেষজ্ঞ বা থেরাপিস্টের কাছে যাবেন?
বেশির ভাগ লাজুক শিশু সময় ও সহায়ক পরিবেশে ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যায়। তবে নিচের বিষয়গুলো একসাথে বা দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করলে শিশুর চিকিৎসক বা শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন:
- নাম ধরে ডাকলে প্রায় কখনোই সাড়া না দিলে
- পরিচিত মানুষ, এমনকি মা-বাবার সাথেও চোখে তাকানো বা হাসির বিনিময় খুব কম হলে
- ইশারা করা, হাত নাড়া বা আঙুল দিয়ে কিছু দেখানোর মতো সামাজিক ভঙ্গি না করলে
- বয়স অনুযায়ী কথা ফোটার ক্ষেত্রে স্পষ্ট দেরি হলে
- আগে যা পারত, তা হঠাৎ করে হারিয়ে ফেললে
এগুলো দেখলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, আবার অপেক্ষা করে বসেও থাকবেন না। আমি শিক্ষিকা, কোনো রোগ বা সমস্যা নির্ণয় করা আমার কাজ নয়। শুধু বলতে পারি, অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ দেখলে ঠিকমতো বুঝে পথ দেখাতে পারবেন।
সাধারণ প্রশ্ন
আমার সন্তান বাড়িতে বকবক করে, বাইরে চুপ। এটা কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ, অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই এমন হয়। নিরাপদ জায়গায় সে স্বচ্ছন্দ, নতুন জায়গায় সময় লাগে। ধীরে ধীরে পরিচিত পরিবেশ বাড়ালে অবস্থার উন্নতি হয়।
কত বছর বয়স থেকে চোখে চোখ রেখে কথা বলা আশা করা যায়?
শিশুরা খুব ছোট বয়স থেকেই মা-বাবার চোখে তাকাতে শুরু করে। তবে অপরিচিত মানুষের সাথে স্বচ্ছন্দ হতে ৩-৬ বছর বয়সেও সময় লাগতে পারে। প্রতিটি শিশুর গতি আলাদা।
স্কুলে শিক্ষিকার সাথে চোখ রেখে কথা বলে না, কী করব?
শিক্ষিকাকে জানান। শিক্ষিকা ছোট দলে বা একান্তে কথা বলার সুযোগ দিলে শিশু ধীরে ধীরে স্বচ্ছন্দ হয়।
মোবাইল দেখা কি চোখে না তাকানোর কারণ?
বেশি সময় স্ক্রিনে কাটালে মুখোমুখি কথোপকথনের সুযোগ কমে যায়, এটা ঠিক। তাই স্ক্রিনের সময় সীমিত রাখুন এবং বেশি সময় মুখোমুখি কথা বলুন।
👁️ মিস পিয়ার মূল কথা:
"শিশুকে সাহসী করতে হলে আগে তার লাজুক স্বভাবকে শ্রদ্ধা করতে হবে। ধীরে ধীরে পা বাড়ালেই সে একদিন পৃথিবীর চোখে চোখ রেখে কথা বলবে।"
আরও পড়ুন
- বন্ধু পাতাতে পারে না বা একা থাকে? সামাজিক মেশার অভ্যাস গড়ে তোলার টিপস
- বড়দের মুখে মুখে তর্ক করা বাচ্চার রাগ সামলানোর ৩টি সম্মানজনক উপায়
- ধন্যবাদ, প্লিজ ও এক্সকিউজ মি: শিশুর ভেতর কৃতজ্ঞতাবোধ ও শিষ্টাচার জাগানো
- খেলনা শেয়ার করতে চায় না? জোর করা কেন ভুল
- নার্সারি ও কেজি স্কুল ইন্টারভিউয়ে শিশুদের আসলে কী কী দেখা হয়?