ধন্যবাদ, প্লিজ ও এক্সকিউজ মি: শিশুর ভেতর কৃতজ্ঞতাবোধ ও শিষ্টাচার জাগানো

প্যারেন্টিং · 2026-10-08

"খালামণি চকলেট দিল, বলো থ্যাঙ্ক ইউ! বলো, বলো!" শিশু মুখ ঘুরিয়ে মায়ের কাঁধে মুখ লুকাল। মা লজ্জায় হেসে বললেন, "আজকাল বাচ্চারা যে কী হয়েছে!"

এই দৃশ্য আমাদের বাসায়, বিয়েবাড়িতে বা আত্মীয়ের ঘরে কতবার দেখেছি। আমরা চাই সন্তান ভদ্র হোক, মিষ্টি করে কথা বলুক। কিন্তু অনেক সময় জোর করে শব্দ বলানোর চেষ্টায় শিশু শব্দটা শেখে, মানেটা শেখে না। আজ কথা বলব কীভাবে শিশুর ভেতর থেকে কৃতজ্ঞতা আর শিষ্টাচার জেগে ওঠে।

দ্রুত উত্তর: জোর করে থ্যাঙ্ক ইউ বলালে শিশু শব্দ শেখে, অনুভূতি নয়। নিজে আদর্শ হয়ে, অনুভূতির সাথে শব্দ জুড়ে আর প্রতিদিনের ছোট কৃতজ্ঞতার চর্চায় শিশুকে শিষ্টাচার শেখান।

শিষ্টাচার আর কৃতজ্ঞতা আসলে কী

"ধন্যবাদ" শব্দটা শেখানো সহজ। কিন্তু কৃতজ্ঞতা একটা অনুভূতি: কেউ আমার জন্য কিছু করেছে, আমি সেটা দেখেছি ও মূল্য দিয়েছি। "প্লিজ" মানে আমি অন্যের ইচ্ছা ও সময়কে সম্মান করছি। "এক্সকিউজ মি" মানে আমি জানি আমার চারপাশে আরও মানুষ আছে। শব্দগুলো তাই অনুভূতির খোলস মাত্র। ভেতরের অনুভূতি তৈরি হলে শব্দ আপনা থেকেই আসে।

বাংলায় বললেও কোনো ক্ষতি নেই। "ধন্যবাদ", "দয়া করে", "মাফ করবেন", এই শব্দগুলো ইংরেজির সমান শক্তিশালী। ঘরে যে ভাষায় স্বচ্ছন্দ, সেটাতেই শুরু করুন।

শিশুরা কীভাবে শেখে?

ছোটরা আমাদের উপদেশ কম শোনে, আচরণ বেশি দেখে। আপনি যদি রিকশাচালককে "ভাই, একটু ধীরে যান, ধন্যবাদ" বলেন, কাজের সহকারীকে "দয়া করে পানিটা দেবে?" বলেন, শিশু নিঃশব্দে তা শুষে নেয়। উল্টো দিকটাও সত্যি। বাবা-মা যদি একে অপরকে হুকুমের সুরে কথা বলেন, শিশু সেটাই স্বাভাবিক ভাবে।

তাই প্রথম ধাপ: নিজের ঘরের ভাষা একবার নজর করে দেখুন।

ধাপে ধাপে কী করবেন

১. নিজেই আদর্শ হোন

সন্তানকে ধন্যবাদ দিন। জুতা এনে দিলে বলুন, "আমাকে সাহায্য করলে, ধন্যবাদ।" ভুল করে ধাক্কা দিলে বলুন, "দুঃখিত, আমি খেয়াল করিনি।" শিশুর প্রতি সম্মান দেখালে সে প্রতিদানে সম্মান দেখাতে শেখে।

২. অনুভূতির সাথে শব্দ জুড়ুন

শুধু "বলো থ্যাঙ্ক ইউ" না বলে বলুন, "দাদু তোমার জন্য আম এনেছেন। তিনি তো রোদে হেঁটে এসেছেন। তোমার কেমন লাগছে?" তারপর বলুন, "চলো দাদুকে জানাই যে তোমার ভালো লেগেছে।"

৩. শিশুকে জোর না করে সুযোগ দিন

সবার সামনে জোর করালে শিশু লজ্জা পায় বা বিরোধিতা করে। আপনি নিজে ধন্যবাদ বলে একটু অপেক্ষা করুন। পরে একান্তে বলুন, "আজ তুমি খালামণিকে ছোট্ট হাসি দিয়েছিলে, খুব ভালো লেগেছে। পরেরবার কথায় বলে দেখবে?" এই সময়ের জন্য শিশু ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হয়।

৪. দৈনিক কৃতজ্ঞতার রুটিন

ঘুমের আগে প্রতিদিন তিনটি প্রশ্ন:

  • আজ কে তোমার জন্য ভালো কিছু করেছে?
  • আজ তুমি কার জন্য ভালো কিছু করেছ?
  • আজকের কোন জিনিসটার জন্য তুমি খুশি?

উত্তর ছোট হলেও চলবে। এভাবে ভালো দিকগুলো খোঁজার অভ্যাস তৈরি হয়।

৫. "প্লিজ" এর খেলা

একটি খেলা খেলুন, নাম "জাদুর শব্দ"। আপনি বলুন, "আমি জাদুকরী, 'দয়া করে' শব্দটা না শুনলে কিছু দিতে পারি না!" শিশু কিছু চাইলে হাসিমুখে অভিনয় করুন। মজার ছলে অভ্যাস হয়, কোনো চাপ থাকে না।

৬. "এক্সকিউজ মি" এর জন্য অপেক্ষার অনুশীলন

আপনি ফোনে কথা বললে শিশু বারবার টানে। তাকে আগে শিখিয়ে রাখুন: কাঁধে আলতো হাত রাখবে, আর আপনি হাতের ওপর হাত রেখে জানাবেন যে শুনেছেন। কিছুক্ষণ পর তাকাবেন। অল্প সময়ে শুরু করুন, ধীরে ধীরে সময় বাড়ান। অপেক্ষা করা অভ্যাস করলে "এক্সকিউজ মি" স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

৭. চিঠি ও ছবি দিয়ে ধন্যবাদ

শিক্ষিকা, দারোয়ান, ডাক্তার বা নানুকে ছোট্ট ছবি এঁকে ধন্যবাদ জানান। এতে কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের কথা থাকে না, কাজে রূপ নেয়।

কী বলবেন: নমুনা কথোপকথন

ধরুন চার বছরের তিথি দোকানে চিপস চাইছে।

তিথি: আমাকে চিপস দাও! মা: (শান্ত গলায়) তুমি চিপস চাও, বুঝেছি। এভাবে চাইলে আমার শুনতে একটু কঠিন লাগে। আরেকবার বলবে, জাদুর শব্দটা দিয়ে? তিথি: দয়া করে চিপস দেবে? মা: অবশ্যই, শুনতে কী সুন্দর লাগল! এই নাও। তিথি: ধন্যবাদ মা। মা: তোমাকে স্বাগতম।

কথোপকথনে লক্ষ করুন, মা ধমক দেননি, ভুল ধরেননি। বরং সঠিক বাক্যটি নিজে দেখিয়েছেন এবং সঠিক আচরণে খুশি হয়ে সাড়া দিয়েছেন।

যা করবেন না

  • অন্যের সামনে "বলো, বলো" বলে চাপ দেবেন না।
  • নিজে অভদ্র ব্যবহার করে সন্তানের কাছ থেকে ভদ্রতা আশা করবেন না।
  • ধন্যবাদ বললেই পুরস্কার দেবেন না। এতে শব্দ লেনদেনে পরিণত হয়।
  • ভুল করলে সবার সামনে অপমান করবেন না।
  • শিষ্টাচারকে ভয়ের সাথে জুড়বেন না, যেমন "না বললে কেউ পছন্দ করবে না।"
  • সব কিছু একসাথে শেখাতে যাবেন না। এক সপ্তাহে একটা শব্দে মনোযোগ দিন।

বয়স অনুযায়ী প্রত্যাশা

দুই থেকে তিন বছরের শিশু শব্দ নকল করে, অর্থ এখনও গড়ে ওঠেনি। তাকে ধৈর্য দিন। চার থেকে পাঁচ বছরে সে বুঝতে শুরু করে কেন এটা বলা হয়। ছয় থেকে সাত বছরে সে অন্যের অনুভূতি নিয়ে ভাবতে পারে। প্রতিটি শিশুর গতি আলাদা, তাই তুলনা না করে নিজের সন্তানের অগ্রগতিতে নজর রাখুন।

ঘরোয়া কিছু ছোট অভ্যাস

খাবার টেবিলে রান্নার জন্য মাকে ধন্যবাদ জানানোর নিয়ম রাখতে পারেন। কেউ ঘরে ঢুকলে বা বের হলে সালাম বা বিদায় জানানোর চর্চা করুন। খেলার সময় বন্ধুর খেলনা চাইলে আগে অনুমতি নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিন। শিশু ভালো আচরণ করলে শুধু বলুন, "তুমি যেভাবে অন্যকে সম্মান দেখালে, আমার খুব ভালো লাগল।" এই ছোট স্বীকৃতিই তাকে ভেতর থেকে অনুপ্রাণিত করে। মনে রাখবেন, ধৈর্যই এখানে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কিছুদিন পর পর অগ্রগতি দেখুন, নিখুঁত ফল আশা না করে অল্প উন্নতিকেও উদযাপন করুন।

সাধারণ প্রশ্ন

আমার সন্তান বাসায় ভদ্র, বাইরে চুপ করে থাকে। কেন?

উত্তর: অনেক শিশু অপরিচিত পরিবেশে লাজুক থাকে। চুপ থাকা মানে অভদ্রতা নয়। ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়লে সে নিজেই বলবে। হাত নাড়া বা মাথা নাড়াও একটি ভালো শুরু।

ইংরেজি না বাংলা শব্দ শেখাব?

উত্তর: যে ভাষায় আপনারা ঘরে কথা বলেন, সেটাই। শব্দের চেয়ে সুর ও অনুভূতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভাইবোন বা বন্ধুর জন্য ধন্যবাদ বলতে চায় না, কী করব?

উত্তর: আপনি সামনে সেটার চর্চা করুন। বাড়ির সবাই একে অপরকে ধন্যবাদ বললে শিশু স্বাভাবিকভাবে সেটাকে আপন করে নেয়।

ঠাকুমা বলেন, এসব ইংরেজি আদব অনর্থক। কী বলব?

উত্তর: সম্মানজনক শব্দ যেকোনো ভাষাতেই ভালো। দাদু-নানুর সামনে "জি", "আপনি", "দয়া করে" সবই একই মূল্যবোধের অংশ।

🥣 মিস পিয়ার মূল কথা: শিষ্টাচার আসে দেখে দেখে, জোর করে নয়। আপনার ঘরে যে সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রতিদিন চর্চা হয়, সন্তান সেটাই হৃদয়ে নেয়। শব্দ শেখানোর আগে অনুভূতিটুকু জাগান।

আরও পড়ুন