অতিরিক্ত চঞ্চল বা হাইপার-অ্যাক্টিভ শিশুকে ঘরে শান্ত রাখার সেন্সরি অ্যাক্টিভিটি

খেলায় শেখা · 2026-10-08

"আমার মেয়ে সোফায় লাফায়, টেবিলে চড়ে, এক মিনিট স্থির হয়ে বসে না। সবাই বলে ও হাইপার!" "সারাদিন দৌড়ঝাঁপ করে, রাতে আবার ঘুমাতেও চায় না। আমি তো ক্লান্ত হয়ে গেছি।"

ছোট শিশুরা স্বভাবতই চঞ্চল। তাদের শরীর বেড়ে উঠছে, আর নড়াচড়াই তাদের শেখার প্রধান ভাষা। তবু কিছু শিশুর শক্তি এতটাই বেশি মনে হয় যে মা-বাবা হাঁপিয়ে ওঠেন। এই লেখায় আমি কোনো শিশুকে "হাইপার-অ্যাক্টিভ" বলে লেবেল দিচ্ছি না। সেটা শুধুমাত্র যোগ্য চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন করতে পারেন। আমরা এখানে ঘরে বসে করার মতো সেন্সরি খেলার কথা বলব, যা অনেক চঞ্চল শিশুকে তার শক্তি নিরাপদ পথে ব্যবহার করতে এবং ধীরে ধীরে শান্ত হতে সাহায্য করতে পারে।

দ্রুত উত্তর: অতিরিক্ত চঞ্চল শিশুর শক্তি নিরাপদ পথে ঢালতে ঘরেই ভারী কাজ (ঠেলা, বহন), স্পর্শের খেলা, ভারসাম্যের খেলা আর শান্ত হওয়ার ছোট অভ্যাস কাজে লাগে। দিনের কোন সময়ে কী খেলা হবে তার একটা পরিকল্পনা রাখুন, ঘুমের আগে উত্তেজক খেলা এড়ান। চঞ্চলতা খুব বেশি বা দৈনন্দিন কাজে বাধা হলে শিশু চিকিৎসক বা বিকাশ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

সেন্সরি অ্যাক্টিভিটি কেন সহায়ক হতে পারে?

আমাদের শরীরে শুধু দেখা, শোনা, স্বাদ, গন্ধ আর স্পর্শ নয়, আরও দুটি অনুভূতি আছে: প্রোপ্রিওসেপশন (পেশি ও জোড়ার চাপ ও অবস্থান বোঝা) আর ভেস্টিবুলার (ভারসাম্য ও গতি বোঝা)। অনেক চঞ্চল শিশু শরীরে বেশি চাপ, ধাক্কা বা গতি খোঁজে। ভারী কাজ, ঠেলা, টানা, ঝোলা, বা শক্ত করে জড়িয়ে ধরা তাদের শরীরকে অনেক সময় গুছিয়ে দেয়। এটা শিশুকে শাস্তি দেওয়ার বদলে তার শরীরের চাহিদাটা পূরণ করার চেষ্টা।

এখানে স্পষ্ট করে বলি, সব শিশুর ক্ষেত্রে সব খেলা সমানভাবে কাজ করে না। শিশুকে পর্যবেক্ষণ করে দেখুন কোনটা তাকে শান্ত করে।

শক্তি ঢেলে দেওয়ার খেলা (Heavy Work)

এই খেলাগুলো পেশিতে চাপ দেয়, যা অনেক শিশুর জন্য শান্তিদায়ক।

  • ভারী বই বা কাপড়ের বান্ডিল টানা: একটা কাপড়ের ব্যাগে নরম জিনিস ভরে ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে বয়ে নিতে বলুন।
  • দেয়াল ঠেলা: দুই হাতে দেয়াল ঠেলে "দেয়ালটা সরাও!" ১০ বার গুনুন।
  • ভালুকের হাঁটা: হাত-পায়ে ভর দিয়ে চতুষ্পদ হয়ে হাঁটা। সাথে "কাঁকড়া হাঁটা", "ব্যাঙ লাফ"।
  • বালিশের সুড়ঙ্গ: শিশুকে কুশনের মাঝে চেপে শুইয়ে বলুন, "তুমি এখন পিৎজা, আমি সসের মতো চাপ দিচ্ছি।" নরম চাপ, জোর নয়। শিশুর অনুমতি ও আরাম খেয়াল রাখুন।
  • কাপড় ভাঁজ বা পানির বালতি বহন: ছোট কাজে সাহায্য করলে শিশু গর্বিত বোধ করে।

স্পর্শ ও হাতের খেলা (Tactile Play)

  • চাল বা ডালের বাক্স: একটা বড় বাক্সে চাল ঢেলে তার মধ্যে ছোট খেলনা লুকান। শিশু হাত ডুবিয়ে খুঁজবে। চোখে-মুখে চাল না যায় সেদিকে নজর রাখুন, ছোটদের মুখে দেওয়ার ঝুঁকি থাকলে এড়িয়ে চলুন।
  • ময়দার তাল বা প্লে ডো: টিপা, গোল করা, বেলা। হাতের পেশি আর মনোযোগ দুটোই কাজে লাগে।
  • পানির খেলা: বড় গামলায় পানি, কাপ, চামচ, ফানেল। গরমের দিনে বিশেষ উপযোগী। সবসময় পাশে থাকুন।
  • বালির বা মাটির খেলা: বাড়ির উঠোন বা ছাদে ছোট গর্ত খোঁড়া।

ভারসাম্য ও গতির খেলা (Movement Play)

  • দড়ির ওপর হাঁটা: মেঝেতে একটা দড়ি বা টেপ লাগান, তার ওপর পা ফেলে ফেলে হাঁটা।
  • কুশনের পাহাড়: ওপর দিয়ে ওঠা-নামা। নিরাপত্তার জন্য নিচে নরম বিছানা রাখুন।
  • ধীর দোল: প্রাপ্তবয়স্কের সাহায্যে কম্বলের দোলনায় ধীরে দোলানো। হালকা, ছন্দময়, জোর ঝাঁকুনি নয়।
  • নাচ আর থামা: গান বাজলে নাচবে, থামলে স্থির। শেষে ধীর গানে শরীর শিথিল করা।

শান্ত হওয়ার ছোট ছোট অভ্যাস

  • বেলুন শ্বাস: হাত পেটে রেখে নাক দিয়ে শ্বাস টেনে বেলুন ফোলানো, ধীরে ছাড়া। তিন-চারবার।
  • শান্ত কোণ: ঘরের একটা কোণে নরম কম্বল, বালিশ, কয়েকটা ছবির বই। এটা শাস্তির জায়গা নয়, বিশ্রামের জায়গা। শিশুকে নিজে সাজাতে দিন।
  • বোতলে ঝিকমিক (Glitter Jar): পানি, সামান্য আঠা ও ঝিকমিক ভরা বোতল ঝাঁকিয়ে ধীরে ধীরে থিতু হওয়া দেখা। শিশু বোঝে, তার মনও এমনভাবেই থিতু হয়।
  • দিনের রুটিনে শারীরিক কাজ: সকালে ও বিকেলে খোলা জায়গায় খেলা। ঘুমের এক ঘণ্টা আগে উত্তেজক খেলা বাদ দিয়ে শান্ত কাজ।

দিনের পরিকল্পনা: কখন কী?

  • সকাল: হালকা ব্যায়াম বা ভালুকের হাঁটা, তারপর নাশতা।
  • পড়ার আগে: পাঁচ মিনিট দেয়াল ঠেলা বা লাফ, তারপর বসে ছোট কাজ।
  • বিকেল: বাইরে দৌড়ঝাঁপ, সাইকেল, বা বাগানে খেলা।
  • সন্ধ্যা: পানির খেলা বা প্লে ডো।
  • ঘুমের আগে: আলো কমিয়ে, ধীর গান, শ্বাসের খেলা, গল্প।

নমুনা সংলাপ

শিশু সোফায় লাফাচ্ছে। চিৎকার না করে বলুন:

"আমি দেখছি তোমার শরীরটা লাফাতে চাইছে। সোফায় লাফানো যাবে না, পড়ে গিয়ে ব্যথা পেতে পারো। চলো, কুশনের পাহাড়ে লাফাই, ঠিক নিচে নরম বিছানা আছে।"

যদি তারপরও থামতে না পারে: "চলো ভালুকের মতো হেঁটে রান্নাঘর পর্যন্ত যাই। আমি তোমার সাথে যাচ্ছি।"

এখানে "না" বলার সাথে একটা "হ্যাঁ" দেওয়া হয়েছে।

যা করবেন না

  • "স্থির হয়ে বসো!" বলে বারবার ধমকাবেন না। জোর করে স্থির রাখলে অস্থিরতা বাড়তে পারে।
  • শাস্তি হিসেবে খেলা বন্ধ করবেন না। চঞ্চল শিশুর জন্য নড়াচড়া প্রয়োজন।
  • অন্য শিশুর সাথে তুলনা করবেন না।
  • ঘুমের আগে উত্তেজক খেলা, মোবাইল বা দ্রুত গতির কার্টুন দেবেন না।
  • চিনিযুক্ত খাবার বা পানীয় নিয়ে চরম সিদ্ধান্ত নেবেন না। সন্দেহ থাকলে পুষ্টিবিদ বা শিশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  • নিজেই নিজের সন্তানকে কোনো নামে ডাকবেন না, যেমন "হাইপার" বা "দুষ্টু"।

কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

চঞ্চলতা সাধারণ। কিন্তু নিচের বিষয়গুলো দেখলে শিশু চিকিৎসক বা শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন:

  • বাড়ি, স্কুল, খেলার মাঠ, সব জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত অস্থিরতা, মনোযোগ রাখতে সমস্যা বা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ আচরণ।
  • নিজেকে বা অন্যকে বারবার আঘাত করা।
  • ঘুম খুব কম, খাওয়ায় বড় সমস্যা, বা শব্দ, স্পর্শ, আলোতে অস্বাভাবিক তীব্র প্রতিক্রিয়া।
  • কথা বা বিকাশে দেরি।
  • স্কুল থেকে নিয়মিত অভিযোগ।

এটা রোগ নির্ণয়ের জায়গা নয়, মূল্যায়ন ও সহায়তার সুযোগ। যত আগে বোঝা যায়, শিশুর জন্য তত ভালো।

সাধারণ প্রশ্ন

এসব খেলা কতক্ষণ করব?

প্রতিবার ৫–১৫ মিনিট। দিনে কয়েকবার। শিশুর আগ্রহ না থাকলে জোর করবেন না।

চঞ্চল হলেই কি হাইপার-অ্যাক্টিভ?

না। অনেক সুস্থ শিশুই খুব সক্রিয়। চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞই মূল্যায়ন করতে পারেন।

মোবাইল দিলে তো শান্ত থাকে?

সাময়িকভাবে স্থির হয়, কিন্তু শরীরের চাহিদা মেটে না, আর পরে অস্থিরতা বাড়তে পারে। শারীরিক খেলার পর বিশ্রামে যাওয়া ভালো।

স্কুলে শিক্ষক চঞ্চলতার অভিযোগ করেন, কী করব?

শিক্ষকের সাথে বসে কোন সময়ে কী ঘটে জানুন। ছোট বিরতি, দাঁড়িয়ে কাজ করার সুযোগ, এসব কৌশল নিয়ে একসাথে আলোচনা করুন।

🤸 মিস পিয়ার মূল কথা: "চঞ্চল শিশুর শক্তি সমস্যা নয়, সেটা সঠিক পথ খুঁজছে। চাপ, গতি আর স্পর্শের খেলায় সেই শক্তি ঢেলে দিন। আর যদি চিন্তা থাকে, বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে দ্বিধা করবেন না।"

আরও পড়ুন