পরীক্ষার ভয় ও অ্যাংজাইটি দূর করতে অভিভাবকের ৫টি করণীয়
প্যারেন্টিং · 2026-10-08
"মা, আমার পেট ব্যথা করছে, কাল পরীক্ষা দিতে যাব না!" "পড়া তো সব পারে, কিন্তু পরীক্ষার হলে গেলেই নাকি সব ভুলে যায়।"
পরীক্ষার আগের দিন এমন কথা অনেক ঘরেই শোনা যায়। কখনও শিশুর পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা, ঘুম না আসা, কখনও আবার অকারণে কান্না বা রাগ। আমরা প্রথমে ভাবি ফাঁকি দিচ্ছে, অথচ অনেক সময় পেছনে থাকে ভয়, যাকে আমরা অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগ বলি। একটু ভয় থাকা স্বাভাবিক, এমনকি কিছুটা উপকারীও। কিন্তু ভয় যখন শিশুকে আটকে দেয়, তখন বড়দের এগিয়ে আসতে হয়।
দ্রুত উত্তর: পরীক্ষার ভয় কমাতে আগে শিশুর কথা মন দিয়ে শুনুন, প্রস্তুতি ছোট ধাপে ভাগ করুন, শ্বাসের সহজ অভ্যাস শেখান, ঘুম ও খেলার রুটিন ঠিক রাখুন আর ফলের বদলে চেষ্টার প্রশংসা করুন। ভয় খুব বেশি হলে শিশুর ডাক্তার বা মনোবিদের পরামর্শ নিন।
শিশুর ভয়টা কোথা থেকে আসে?
- ফল নিয়ে চাপ: "A+ না পেলে মুখ দেখাব কী করে?" ধরনের কথা শিশুর মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়।
- তুলনা: প্রতিবেশী বা সহপাঠীর সাথে বারবার তুলনা।
- প্রস্তুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা: কতটুকু পড়া হয়েছে, বুঝতে না পারা।
- অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতা: আগে একবার কম নম্বর পেয়ে বকা খাওয়া।
- বড়দের নিজের দুশ্চিন্তা: আমাদের উৎকণ্ঠা শিশু ঠিকই টের পায়।
৫টি করণীয়
১. আগে ভয়টা শুনুন, তারপর সমাধান
অনেক অভিভাবক তাড়াতাড়ি বলে ফেলেন, "ভয়ের কী আছে? সব তো পারো!" এতে শিশু বোঝে, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বরং বলুন, "তোমার ভয় লাগছে, এটা আমি বুঝতে পারছি। কোন জায়গাটা বেশি ভয় লাগছে?" শুনুন, মাঝে থামাবেন না। অনুভূতির নাম দিতে পারলেই ভয় অর্ধেক কমে যায়।
২. প্রস্তুতিকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করুন
"সব পড়া" একটা বিশাল পাহাড়, কিন্তু "আজ শুধু দুটো অধ্যায়" একটা ছোট সিঁড়ি। পরীক্ষার তিন-চার সপ্তাহ আগে থেকে একটা সাধারণ ছক বানান। প্রতিটি অংশ শেষ হলে টিক দিন। চোখের সামনে অগ্রগতি দেখলে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ঘরে পড়া কীভাবে ঝালিয়ে নেবেন, তা নিয়ে আমাদের স্পেসড রিপিটেশনের লেখাটি সাহায্য করবে।
৩. শরীর শান্ত করার সহজ অভ্যাস শেখান
ভয় লাগলে হৃদস্পন্দন বাড়ে, শ্বাস দ্রুত হয়। শরীরকে শান্ত করলে মনও শান্ত হয়।
- ফুলের গন্ধ, মোমবাতি নেভানো শ্বাস: নাক দিয়ে ধীরে শ্বাস নিন (ফুলের ঘ্রাণ নেওয়ার মতো), মুখ দিয়ে আস্তে ছাড়ুন (মোমবাতি নেভানোর মতো)। ৫ বার করুন।
- হাত চেপে ছেড়ে দেওয়া: মুঠো শক্ত করে ধরে ৫ সেকেন্ড, তারপর ছেড়ে দেওয়া।
- ৫-৪-৩-২-১: পাঁচটা জিনিস দেখুন, চারটা ছুঁয়ে দেখুন, তিনটা শব্দ শুনুন, দুটো গন্ধ নিন, একটা স্বাদ ভাবুন।
পরীক্ষার আগের সপ্তাহে প্রতিদিন একবার অভ্যাস করান, যেন পরীক্ষার হলে কাজে আসে।
৪. ঘুম, খাবার ও খেলার রুটিন ঠিক রাখুন
পরীক্ষার সময় অনেকে খেলা বন্ধ করে দেন, ঘুম কমিয়ে দেন। এতে ভয় আরও বাড়তে পারে। প্রতিদিন:
- পর্যাপ্ত ঘুম (বয়স অনুযায়ী ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা সাধারণত ভালো মনে করা হয়)।
- সময়মতো সুষম খাবার, বিশেষ করে সকালের নাশতা।
- ২০–৩০ মিনিট বাইরে খেলা বা হাঁটা।
- শোয়ার আগে স্ক্রিন বন্ধ রাখা।
পরীক্ষার আগের রাতে নতুন কিছু পড়ানোর চেষ্টা না করে হালকা ঝালিয়ে নিয়ে ঘুমাতে দিন।
৫. ফলের বদলে চেষ্টার প্রশংসা করুন
"তুমি কতটা সময় ধরে মন দিয়ে পড়েছ, আমি দেখেছি।" এই ধরনের কথা শিশুকে নিরাপদ বোধ করায়। তাকে বলুন, নম্বর যাই হোক, আপনি তার পাশে আছেন। এই নিরাপত্তাবোধ পরীক্ষার ভয় কমানোর সবচেয়ে বড় ওষুধ। চেষ্টা ও মেধার প্রশংসা নিয়ে আমাদের আলাদা একটি লেখাও আছে।
পরীক্ষার সকালের একটি নমুনা
- সময়ের আগে ঘুম থেকে ডাকুন, তাড়াহুড়া এড়াতে।
- হালকা খাবার খাওয়ান, অতিরিক্ত ভারী নয়।
- বলুন: "তুমি যা শিখেছ, সেটুকুই লিখো। না পারলে পরের প্রশ্নে চলে যেও, পরে ফিরে এসো।"
- বিদায়ের সময় একটা আলিঙ্গন ও হাসি।
- ফিরে এলে প্রথমেই "কত পেলে?" না জিজ্ঞেস করে বলুন, "কেমন লাগল? কোনটা মজার ছিল?"
একটি সম্ভাব্য কথোপকথন
শিশু: মা, যদি আমি ফেল করি?
মা: ভয় লাগছে, তাই না? আমি বুঝতে পারছি। আচ্ছা বলো তো, তুমি এ সপ্তাহে কত কিছু শিখেছ?
শিশু: অনেক কিছু।
মা: তাহলে ভরসা রাখো। আর শোনো, নম্বর কম হলেও তুমি আমার কাছে একই রকম প্রিয় থাকবে। আমরা একসাথে দেখব কোথায় আরও সাহায্য লাগে।
যা করবেন না
- "এবার যদি ভালো না করো, তাহলে..." ধরনের হুমকি দেবেন না।
- সন্তানের সামনে অন্যের নম্বর নিয়ে আলোচনা করবেন না।
- সবকিছু ফেলে সারাদিন শুধু পড়তে বসাবেন না।
- ভয়কে ছোট করে বলবেন না, "এত ভয় পেলে চলবে?"
- পরীক্ষার আগের রাতে বেশি বকাঝকা বা তর্ক করবেন না।
কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন
পরীক্ষার আগে একটু ভয় বা অস্থিরতা স্বাভাবিক। তবে এই লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন ধরে থাকলে শিশু চিকিৎসক বা শিশু মনোবিদের সাথে কথা বলুন:
- প্রায়ই পেট ব্যথা বা মাথা ব্যথা, যার শারীরিক কারণ পাওয়া যায় না।
- ঘুম বা খাওয়ায় বড় পরিবর্তন।
- স্কুলে যেতে ক্রমাগত অস্বীকার।
- খুব বেশি কান্না, রাগ বা গুটিয়ে যাওয়া।
- পরীক্ষা ছাড়াও অন্য বিষয়ে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা।
এটা কোনো রোগ নির্ণয় নয়। বিশেষজ্ঞ কেবল বুঝতে সাহায্য করবেন কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন।
সাধারণ প্রশ্ন
ছোট বয়সে কি পরীক্ষার ভয় হয়?
হ্যাঁ, বিশেষ করে ক্লাস ওয়ান-টু থেকেই কিছু শিশু ভয় পায়, বিশেষ করে বাড়ির চাপ বেশি থাকলে।
পরীক্ষার আগে পুরস্কারের লোভ দেখানো কি ঠিক?
ফলের জন্য বড় পুরস্কারের লোভ চাপ বাড়াতে পারে। বরং পরীক্ষা শেষে একসাথে ছোট কিছু উদযাপন করুন, ফল যাই হোক।
সন্তান পরীক্ষার হলে সব ভুলে যায়, কী করব?
শ্বাসের কৌশল অভ্যাস করান এবং বাড়িতে নকল পরীক্ষা দিয়ে অভ্যস্ত করুন। হলে গিয়ে প্রথমে সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করার কথা বলুন।
নিজের দুশ্চিন্তা সামলাব কীভাবে?
আপনার শান্ত থাকাটাই সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় সহায়তা। নিজেও গভীর শ্বাস নিন, অন্য বড়দের সাথে মন খুলে কথা বলুন।
🌿 মিস পিয়ার মূল কথা: "পরীক্ষা সন্তানের পুরো মূল্য মাপে না। ভয়কে বকুনি দিয়ে নয়, ভালোবাসা, ছোট অভ্যাস আর শান্ত পাশে থাকা দিয়ে হারাতে শেখান।"
আরও পড়ুন
- অন্ধকার ও ভূতের ভয়: শিশুকে উপহাস না করে তার অন্তরের ভয় দূর করার বৈজ্ঞানিক উপায়
- পাবলিক প্লেসে বাচ্চার চরম জেদ সামলাতে অভিভাবকের করণীয়
- বাচ্চা কি বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে? স্কুলের ভয় বা মন খারাপ চেনার গোপন লক্ষণ
- বাচ্চা যখন রেগে গিয়ে কামড়ায়, চিমটি কাটে বা মারে: অভিভাবকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
- খেলনা শেয়ার করতে চায় না? জোর করা কেন ভুল