রাইমস ও ছড়া শুনে শিশুর কথা দ্রুত ফোটার কারণ

ফনিক্স ও ভাষা · 2026-10-08

"দাদি রোজ ঘুমের আগে ছড়া বলেন, আর আমার মেয়ে ঘুমঘুম চোখেও ঠোঁট নেড়ে সঙ্গে বলার চেষ্টা করে।" "ছড়া কি আসলেই কাজে লাগে, নাকি এগুলো শুধু পুরোনো দিনের অভ্যাস?"

আমাদের দাদি-নানিরা বিজ্ঞানের বই না পড়েও জানতেন, শিশুকে কোলে নিয়ে ছড়া বললে সে তাড়াতাড়ি হাসে, তাকায়, সাড়া দেয়। আজকের শিক্ষাবিদরাও ভাষা বিকাশে ছড়া ও গানের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। এখানে আমি সরল ভাষায় বলার চেষ্টা করব, কেন ছড়া কাজে লাগে এবং কীভাবে সেটা প্রতিদিনের জীবনে ব্যবহার করবেন। কোনো বড় দাবি বা সংখ্যা এখানে নেই, কেবল সাধারণভাবে স্বীকৃত কথাগুলো।

দ্রুত উত্তর: ছড়ার ছন্দ, পুনরাবৃত্তি আর শব্দের মিল শিশুর কানকে ধ্বনি চিনতে শেখায়, মুখ ও জিভকে নাড়াতে অভ্যস্ত করে এবং আপনার সাথে সংযোগ গড়ে। তাই রোজ ঘুমের আগে বা গোসলের সময় ২–৩টি পরিচিত ছড়া বলুন। এতে শিশুর ভাষা বিকাশের ভিত শক্ত হয়, তবে কথা কখন ফুটবে তা প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে আলাদা।

ছড়া কেন এত কার্যকর বলে মনে করা হয়

১. ছন্দ কানকে প্রশিক্ষণ দেয়

ছড়ায় শব্দ বারবার ফিরে আসে এবং ধ্বনির মিল থাকে: "আয় আয় চাঁদ মামা, টিপ দিয়ে যা।" "মামা" আর "যা" এর অন্তঃমিল শিশুর কানকে ধ্বনির নকশা চেনায়। ধ্বনি চেনার এই দক্ষতা পরবর্তীতে পড়তে শেখার একটি ভিত্তি। ফনিক্সের পরিভাষায় একে বলে ফোনোলজিক্যাল অ্যাওয়ারনেস।

২. পুনরাবৃত্তি স্বস্তি দেয়

ছোট শিশুরা একই জিনিস বারবার শুনতে ভালোবাসে। বারবার শোনার ফলে সে পরের অংশটা আন্দাজ করতে পারে। আন্দাজ মিলে গেলে তার আনন্দ হয়। এই আনন্দই তাকে নিজে বলতে উৎসাহ দেয়।

৩. মুখ ও জিভের ব্যায়াম

ছড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট নড়ে, জিভ কাজ করে। "ঝিকিমিকি" বা "টুপটাপ"-এর মতো ধ্বনির কাজ উচ্চারণের জন্য ভালো অনুশীলন।

৪. স্মৃতি জোরদার করে

গদ্যের চেয়ে ছন্দোবদ্ধ কিছু মনে রাখা সহজ। ছড়া মুখস্থ হয়ে গেলে শিশুর মধ্যে "আমি পারি" বোধ জন্মায়।

৫. ভালোবাসার সংযোগ

কোলে বসে, চোখে চোখ রেখে, সুর করে বলা ছড়া শুধু ভাষা শেখায় না, নিরাপত্তার অনুভূতিও দেয়। আর যে শিশু নিরাপদ বোধ করে, সে সহজে কথা বলতে ভরসা পায়।

বয়স অনুযায়ী ছড়ার ব্যবহার

০-১ বছর

এ সময় অর্থ বোঝার কথা নয়, কিন্তু সুর ও আপনার মুখভঙ্গি তার ভালো লাগে। হাতের আঙুল নাচিয়ে, পায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে ছড়া বলুন।

১-২ বছর

হাততালি, ইশারা আর শব্দের সঙ্গে যুক্ত ছড়া। "এক্কা দোক্কা", "হাত ধুয়ে নাও।" শিশু ইশারা অনুকরণ করবে, ছড়ার শেষ শব্দ বলার চেষ্টা করবে।

২-৩ বছর

ছড়ার শেষ শব্দ বাদ দিয়ে অপেক্ষা করুন। "আয় আয় চাঁদ মামা, টিপ দিয়ে ...?" শিশু শূন্যস্থান পূরণ করবে।

৩-৫ বছর

নতুন শব্দ বানানোর খেলা: "বেড়াল, বেড়াল, ... কোন শব্দের সঙ্গে মিলবে?" ছড়ায় ভুল শব্দ বসিয়ে হাস্যকর বানিয়ে দিন, সে শুধরে দেবে।

ঘরে ছড়া-সময় বানানোর ধাপ

  1. নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন: স্নানের আগে, ঘুমের আগে বা গাড়ির সফরে।
  2. প্রিয় ছড়া বেছে নিন: তিন-চারটি ছড়া দিয়ে শুরু। বারবার বলুন।
  3. ইশারা যুক্ত করুন: হাত, মুখ, শরীর দিয়ে অভিনয়।
  4. থামুন: শেষ শব্দে এসে থামুন। শিশুকে বলার সুযোগ দিন।
  5. নতুন করে বানান: নিজের মতো করে লাইন জুড়ে দিন। শিশুর নাম বসিয়ে দিন। "আয় আয় ইরা সোনা।"
  6. ধীরে নতুন ছড়া আনুন: পুরোনোটা পাকা হলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে করণীয়

আমাদের লোকছড়া, ঘুমপাড়ানি গান, খেলার ছড়া সবই অমূল্য সম্পদ। ইউটিউবের ইংরেজি রাইমস দেখে ফেলার আগে, আমাদের নিজের ছড়াগুলো শিশুকে শোনান। পরিবারের বড়দের বলুন, তারা কোন কোন ছড়া জানেন। দাদি-নানির কাছ থেকে শোনা ছড়া লিখে রাখুন। এতে সন্তানের ভাষা যেমন সমৃদ্ধ হয়, তেমনি সংস্কৃতির সঙ্গেও যোগ তৈরি হয়। ইংরেজি রাইমসও শেখাতে পারেন, কেবল সেগুলো আপনার নিজের গলায় বলুন।

ছড়ার সঙ্গে দৈনন্দিন কাজ জুড়ে দিন

ছড়া শুধু বিছানায় বসেই বলতে হবে, এমন নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের জন্য আলাদা ছড়া বানিয়ে নিলে কাজও সহজ হয়, ভাষাও বাড়ে।

  • হাত ধোয়ার সময়: "পানি পানি টুপটাপ, সাবান দিয়ে ঘষঘষ।" শিশু ছড়ার তালে হাত ধোয়, আপনি আর তাড়া দিতে হয় না।
  • জামা পরার সময়: "হাতটা ঢোকাও সুড়ুত করে, মাথাটা বেরোক ফুড়ুত করে।"
  • খেলনা গোছানোর সময়: একটা ছোট গান বানিয়ে ফেলুন, যা গোছানোর শুরুতে গাইবেন।
  • গাড়ি বা রিকশায় বসে: আশপাশে যা দেখছেন, তা দিয়েই মজার ছড়া। "ঐ যে গাছ, সবুজ গাছ।"

এভাবে ছড়া হয়ে ওঠে জীবনের অংশ। আর শিশু বুঝতে পারে, ভাষা শুধু বইয়ের জিনিস নয়, ঘরের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গী।

নমুনা কথোপকথন

আপনি: "চলো, আজ আমরা আমাদের ছড়া বলি। 'আতা গাছে তোতা পাখি...' এরপর কী?" শিশু: "ডালিম গাছে মৌ!" আপনি: "বাহ! তুমি তো জানো! এবার আমরা পাখিটাকে বদলে দিই। আতা গাছে... বেড়াল ছানা? বলো তো, বেড়াল ছানা কী করে?" শিশু: "মিউ মিউ!" আপনি: "আরে বাহ, আমরা একটা নতুন ছড়া বানিয়ে ফেললাম!"

যা করবেন না

  • ছড়া আবৃত্তি করতে বাধ্য করবেন না, বিশেষত অতিথির সামনে। "ওদের একটা ছড়া শুনিয়ে দাও" বললে অনেক শিশু লজ্জা পায়।
  • ভুল বললে শুধরাতে ব্যস্ত হবেন না। আপনি শুধু ঠিক জিনিসটা আরেকবার সুন্দর করে বলুন।
  • সারাদিন ট্যাব বা টিভিতে ছড়ার ভিডিও চালিয়ে রেখে ভাববেন না কাজ সারা হলো। আপনার মুখ, ইশারা আর প্রতিক্রিয়া ভিডিও দিতে পারে না।
  • খুব দ্রুত বা খুব বেশি ছড়া শেখাবেন না। কম, কিন্তু প্রিয়।
  • ছড়ার ভেতরে ভয়ের বা অশোভন শব্দ আছে কি না, আগে মিলিয়ে নিন।

কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

আমি শিক্ষিকা, চিকিৎসক নই এবং কিছু নির্ণয় করি না। তবে ছড়া, গান বা কথায় শিশুর যদি দীর্ঘদিন কোনো সাড়া না মেলে, ডাকলে তাকায় না, আগে যা বলত তা হঠাৎ বন্ধ করে দেয়, কিংবা শ্রবণশক্তি নিয়ে সন্দেহ হয়, তাহলে দেরি না করে শিশু চিকিৎসক বা স্পিচ থেরাপিস্টের কাছে যান। ছড়া কোনোভাবেই চিকিৎসার বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্ন

ছড়া শুনলেই কি শিশু তাড়াতাড়ি কথা বলবে?

কোনো একক উপায় সবার জন্য একই ফল দেয় না। তবে ছড়া ভাষার পরিবেশ ভালো করে, এটা বলা যায়।

একই ছড়া বারবার বললে কি বিরক্ত হবে?

সাধারণত না। ছোটদের কাছে পরিচিত জিনিস বিশেষ আনন্দের। আপনি বিরক্ত হলে একটু সুর বদলে দিন।

আমি গাইতে পারি না, কী করব?

আপনার সন্তান আপনার গানের সমালোচক নয়, সবচেয়ে বড় ভক্ত। সুর ভুল হলেও ক্ষতি নেই, গলার উষ্ণতাটাই আসল।

ইংরেজি রাইমস আগে নাকি বাংলা ছড়া?

দুটোই চলতে পারে। মাতৃভাষার ছড়া দিয়ে শুরু করলে ভাষার ভিত শক্ত হয়। ইংরেজি রাইমস যোগ করুন ধীরে।

🎵 মিস পিয়ার মূল কথা: "ছড়া হলো ভাষার প্রথম খেলা। বিশেষ কোনো সরঞ্জাম লাগে না, শুধু আপনার কণ্ঠ আর কিছুটা সময়। আজ রাতে ঘুমের আগে একটা ছড়া দিয়েই শুরু করুন।"

আরও পড়ুন