২ বছর বয়সে বাচ্চার কয়টি শব্দ বলা উচিত? মাইলস্টোন চার্ট ও শিক্ষিকা টিপস

ফনিক্স ও ভাষা · 2026-10-08

"খালার মেয়েটা তো দেড় বছরেই পুরো ছড়া বলত। আমার ছেলে দুই বছর হয়ে গেল, শুধু 'মা' আর 'বাবা' বলে।" "ডাক্তার দেখাব কি না বুঝতে পারছি না, আবার সবাই বলছে দেরিতে কথা বলা নাকি ভালো লক্ষণ!"

দুই বছর বয়সের মা-বাবাদের কাছ থেকে এই কথাগুলো আমি প্রায়ই শুনি। পারিবারিক আড্ডায় একটা বাচ্চার সঙ্গে আরেকটার তুলনা শুরু হলেই বুকের ভেতর খচখচ করে। এই লেখায় আমরা শান্তভাবে বুঝব, দুই বছরে সাধারণত শিশুরা কেমন কথা বলে, কোনটা স্বাভাবিক পরিসরের মধ্যে পড়ে, আর ঘরে বসে আপনি কীভাবে সাহায্য করতে পারেন।

দ্রুত উত্তর: দুই বছর বয়সে অনেক শিশু মোটামুটি কয়েক ডজন শব্দ বলে এবং দুটি শব্দ জুড়তে শুরু করে, তবে প্রতিটি শিশুর গতি আলাদা। শব্দ গোনার চেয়ে সে কতটা বোঝে আর ইশারায় যোগাযোগ করে কি না, সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুশ্চিন্তা থাকলে শিশু চিকিৎসক বা স্পিচ থেরাপিস্টের পরামর্শ নিন।

আগে একটা কথা পরিষ্কার করি

প্রতিটি শিশু আলাদা গতিতে বড় হয়। কেউ আগে হাঁটে, কেউ আগে কথা বলে। নিচের চার্টটি কোনো পরীক্ষার ফলাফল নয়, এটি একটি মোটামুটি দিকনির্দেশনা। এটি দেখে আপনি নিজের সন্তানকে "পাস" বা "ফেল" করাবেন না। উদ্দেশ্য হলো বুঝে নেওয়া, কখন আরেকটু মনোযোগ দিতে হবে।

দুই বছর বয়সে সাধারণত কী দেখা যায়

শব্দের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন উৎসে একটু ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। মোটামুটি ধারণা এমন যে, দুই বছরের কাছাকাছি অনেক শিশু কয়েক ডজন শব্দ ব্যবহার করে এবং দুটি শব্দ জোড়া লাগিয়ে ছোট বাক্য বলতে শুরু করে। তবে স্বাভাবিক পরিসর বেশ বড়। তাই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার পেছনে না ছুটে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল করুন।

ভাষা বিকাশের মোটামুটি চার্ট

বয়সসাধারণত যা দেখা যায়
১২ মাসডাকলে তাকায়, "মা", "বাবা" জাতীয় শব্দ, ইশারা করে বোঝায়
১৮ মাসকয়েকটি পরিচিত শব্দ, "দাও", "নাও", "আর" ধরনের চাওয়া, সহজ নির্দেশ বোঝে
২ বছরনতুন শব্দ দ্রুত শেখে, দুটি শব্দ জুড়ে বলে, যেমন "মা পানি" বা "বাবা যাব"
৩ বছরছোট বাক্যে কথা বলে, প্রশ্ন করে, পরিচিতরা বেশিরভাগ কথা বুঝতে পারে

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশু কত শব্দ বলে তার চেয়ে কত শব্দ বোঝে। যে শিশু "জুতো আনো" বললে জুতো এনে দেয়, তার ভেতরে ভাষা ঠিকই বাড়ছে, বলার পালা হয়তো একটু পরে আসবে।

বলার চেয়ে বোঝাটা কেন বেশি জরুরি

ভাষা দুই দিক দিয়ে চলে। এক দিকে বোঝা, অন্য দিকে বলা। আগে বোঝা তৈরি হয়, তারপর বলা। তাই এই প্রশ্নগুলো নিজেকে করুন।

  • নাম ধরে ডাকলে সে কি আপনার দিকে তাকায়?
  • "বলটা দাও" বললে কি বল তুলে দেয়?
  • চোখ, নাক, মুখ কোথায় জিজ্ঞেস করলে কি দেখাতে পারে?
  • আঙুল দিয়ে কিছু দেখিয়ে আপনার মনোযোগ টানে কি?
  • আপনার হাসি বা মুখভঙ্গির জবাব দেয় কি?

এসবের উত্তর বেশিরভাগ "হ্যাঁ" হলে সাধারণত ভাষার ভিত শক্ত হচ্ছে বলে ধরা যায়।

ঘরে বসে শব্দ বাড়ানোর ৬টি কাজ

১. যা করছেন তাই বলুন (Narration)

রান্নাঘরে, গোসলের সময়, রাস্তায় হাঁটার সময় আপনার কাজগুলো ছোট বাক্যে বলুন। "এই দেখো, ডিম। ডিম ভাঙলাম। ডিম ভাজছি।" সপ্তাহখানেক এভাবে করলেই দেখবেন সে একই শব্দগুলো নিজের মতো করে বলার চেষ্টা করছে।

২. একটু বেশি অপেক্ষা করুন

শিশু কিছু চাইলে আঙুল দেখানো মাত্র জিনিস হাতে ধরিয়ে দেবেন না। জিজ্ঞেস করুন, "কী চাও? পানি?" তারপর তিন-চার সেকেন্ড চুপ করে চেয়ে থাকুন। এই ছোট বিরতিটা তাকে চেষ্টা করার জায়গা দেয়।

৩. তার শব্দকে একটু বাড়িয়ে ফিরিয়ে দিন

সে বলল "পানি"। আপনি বলুন, "হ্যাঁ, ঠান্ডা পানি খাবে।" সে বলল "গাড়ি"। আপনি বলুন, "লাল গাড়ি যাচ্ছে!" তাকে শুধরে দেওয়ার দরকার নেই, শুধু সুন্দর করে শব্দটা বাড়িয়ে দিন।

৪. ছবির বই আর ছড়া

রোজ দশ মিনিট ছবির বই নিয়ে বসুন। ছবিতে আঙুল রেখে নাম বলুন, প্রাণীর আওয়াজ করুন। "আয় আয় চাঁদ মামা" জাতীয় ছড়ার তালে তালে হাততালি দিন। ছন্দ ভাষার সবচেয়ে মজার বন্ধু।

৫. পছন্দ দিন

"দুধ খাবে, নাকি পানি?" এভাবে দুটি বিকল্প দিলে সে শব্দ বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়। উত্তর না দিলেও আপনি শব্দ দুটি বলে দিয়েছেন, সেটাই শেখা।

৬. খেলার মধ্যে কথা

বালিশ দিয়ে ঘর বানানো, পুতুলকে খাওয়ানো, গাড়ি গ্যারেজে রাখা, এসব ভান করার খেলায় শিশুরা সবচেয়ে বেশি নতুন শব্দ শেখে। আপনি নিজে খেলায় নামুন।

নমুনা কথোপকথন

শিশু রুটির দিকে আঙুল তুলে "উ... উ..." করছে।

আপনি (হাসিমুখে, চোখে চোখ রেখে): "ও, তুমি কী চাও? রুটি?" শিশু: "টি।" আপনি: "হ্যাঁ! রুটি! তুমি রুটি খাবে। নরম রুটি। নাও, রুটি।"

লক্ষ্য করুন, এখানে আপনি ভুল ধরেননি, চাপ দেননি, শুধু সঠিক শব্দটা আনন্দের সঙ্গে শুনিয়েছেন।

যা করবেন না

  • "বলো, বলো, বলো" বলে বারবার চাপ দেবেন না। চাপ বাড়লে শিশু আরও চুপ হয়ে যেতে পারে।
  • ভুল বললে হেসে উড়িয়ে দেবেন না বা সবার সামনে "বলে দেখাও" বলবেন না।
  • অন্য বাচ্চার সঙ্গে তুলনা করে তার সামনে দুঃখ প্রকাশ করবেন না।
  • সারাদিন মোবাইল বা টিভি চালিয়ে রেখে ভাবা চলবে না যে সে শুনে শুনেই শিখবে। জীবন্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা, চোখে চোখ রাখা ভাষার আসল শিক্ষক।
  • বাড়িতে তিনটি ভাষা একসঙ্গে ঢালাওভাবে ব্যবহার করে বিভ্রান্ত করবেন না। একজন একটি ভাষায় কথা বললে সুবিধা হয়।

কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

আমি শিক্ষিকা, চিকিৎসক নই, তাই কোনো রোগনির্ণয় করব না। তবে নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি থাকলে শিশু চিকিৎসক বা স্পিচ থেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো। দেরি না করে আগেভাগে দেখিয়ে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

  • ডাকলে প্রায়ই সাড়া দেয় না, শব্দে চমকায় না বা শুনতে অসুবিধা হচ্ছে বলে সন্দেহ হয়।
  • আগে যে শব্দগুলো বলত, সেগুলো হঠাৎ বলা বন্ধ করে দিয়েছে।
  • দুই বছর পেরিয়েও প্রায় কোনো অর্থপূর্ণ শব্দ নেই, ইশারাও করে না।
  • সহজ নির্দেশ, যেমন "এদিকে এসো" বুঝতে পারে না বলে মনে হয়।
  • চোখে চোখ রাখে না, আপনার সঙ্গে খেলায় আগ্রহ দেখায় না।

এগুলো থাকলেই কোনো সমস্যা আছে তা নয়, কিন্তু পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া নিশ্চিন্ত হওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায়।

সাধারণ প্রশ্ন

ছেলেরা কি মেয়েদের চেয়ে দেরিতে কথা বলে?

অনেকের অভিজ্ঞতায় এমনটা দেখা যায়, তবে এটা নিয়ম নয়। লিঙ্গ দেখে অপেক্ষা না করে শিশুর সামগ্রিক অগ্রগতি দেখুন।

দুই ভাষার পরিবারে কথা দেরিতে ফোটে কি?

দুই ভাষা শুনে বড় হওয়া শিশু প্রথম দিকে দুই ভাষার শব্দ মিশিয়ে বলতে পারে। এটা বিভ্রান্তি নয়, স্বাভাবিক। মোট শব্দ ধরলে সে পিছিয়ে নেই। দুই ভাষা নিয়ে আমার আলাদা লেখাটিও দেখে নিতে পারেন।

স্ক্রিনে ছড়ার ভিডিও দেখালে কি শব্দ শেখে?

ভিডিও সীমিত পরিমাণে পরিপূরক হতে পারে, কিন্তু আপনার সঙ্গে কথোপকথনের বিকল্প নয়। আর অনেক ছোট শিশুর জন্য স্ক্রিন একেবারে কম রাখাই ভালো।

কান কি পরীক্ষা করানো দরকার?

কথা ফুটতে দেরি হলে শ্রবণশক্তি পরীক্ষা সাধারণত প্রথম ধাপগুলোর একটি। চিকিৎসকের পরামর্শে সেটি করানো যায়।

🗣️ মিস পিয়ার মূল কথা: "শব্দ গুনে গুনে সন্তানকে মাপবেন না, কথার পরিবেশ বানিয়ে দিন। প্রতিদিন একটু গল্প, একটু ছড়া, একটু অপেক্ষা। আর মনে খটকা লাগলে লজ্জা না পেয়ে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। মায়ের মন যা অনুভব করে, তাকে গুরুত্ব দিন।"

আরও পড়ুন