শিশুর প্রতিদিনের আদর্শ স্ক্রিন টাইম কত? ডব্লিউএইচও (WHO) গাইডলাইন

স্ক্রিন টাইম · 2026-10-08

"সারাদিনে ঠিক কতক্ষণ কার্টুন দেখানো যায়, আপা? সবাই আলাদা আলাদা কথা বলে!" "আমার ছেলের বয়স আড়াই। তিন ঘণ্টা দেখলে কি খুব বেশি?"

স্ক্রিন টাইম নিয়ে বাবা-মায়ের মনে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন, এই "কতক্ষণ"। আত্মীয়, প্রতিবেশী, ইউটিউবের ভিডিও, প্রত্যেকে আলাদা কথা বলে। তাই আজ আমরা ভরসা করব একটি স্বীকৃত উৎসের ওপর: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও-র শিশুদের জন্য শারীরিক কার্যকলাপ, বসে থাকা ও ঘুম বিষয়ক গাইডলাইন।

ডব্লিউএইচও কী পরামর্শ দেয়?

ডব্লিউএইচও-র পরামর্শে শিশুদের "বসে থাকা অবস্থায় স্ক্রিন সময়" সীমিত রাখতে বলা হয়েছে। বয়সভেদে সংক্ষেপে:

  • এক বছরের নিচে: স্ক্রিন সময় নেই। অর্থাৎ বাদ দেওয়াই ভালো।
  • ১ থেকে ২ বছর: স্ক্রিন সময় নেই। অর্থাৎ বাদ দেওয়াই ভালো। এই বয়সে বসে থাকার সময়ে গল্প বা গান শোনা ও আপনার সঙ্গে কথোপকথনকে উৎসাহিত করা হয়।
  • ২ থেকে ৪ বছর: বসে থাকা অবস্থায় স্ক্রিন সময় দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা, কম হলে আরও ভালো।
  • ৫ বছরের বেশি: আলাদা ঘণ্টা-সীমা সংস্থা নির্ধারণ করেনি, তবে বসে থাকা ও বিনোদনের স্ক্রিন সময় সীমিত রাখা এবং শারীরিক কার্যকলাপ, ঘুম ও সামাজিক সময় বজায় রাখার কথা বলা হয়।

এই সংখ্যাগুলোকে "সর্বোচ্চ সীমা" হিসেবে দেখুন, "লক্ষ্য" হিসেবে নয়। কম হলে ক্ষতি নেই, বরং ভালো।

সময়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়

শুধু ঘণ্টা গুনলে চলবে না। এগুলোও দেখুন:

  • কনটেন্ট: ধীর, শিক্ষামূলক ও বয়সোপযোগী কিনা।
  • সময়: খাওয়ার সময় ও ঘুমের আগে স্ক্রিন আছে কিনা।
  • সঙ্গ: আপনি পাশে বসে কথা বলছেন কিনা।
  • বিকল্প: শিশুর বাইরে খেলা, ঘুম ও গল্পের জন্য যথেষ্ট সময় আছে কিনা।
  • বদলের সময়: স্ক্রিন বন্ধের সময় সে কতটা শান্ত।

দেখা গেছে, পাশে বসে কথা বলে দেখা ১৫ মিনিট আর একা একা চুপচাপ ১৫ মিনিটের অভিজ্ঞতা এক নয়।

ঘরে প্রয়োগের ছক

০–২ বছর

  • স্ক্রিন নয়। অন্য কেউ ফোন ব্যবহার করলে শিশুর সামনে যতটা সম্ভব কম।
  • ভিডিও কলে দাদা-দাদি বা আত্মীয়ের সাথে কথা বলা তুলনামূলক ভিন্ন বিষয়, পাশে বসে সংক্ষেপে হতে পারে।
  • বিকল্প: ছড়া, গান, বই, খেলনা, মেঝেতে গড়াগড়ি।

২–৪ বছর

  • সর্বোচ্চ দিনে ১ ঘণ্টা, ভাগ করে (যেমন ২০ + ২০ মিনিট)।
  • নির্দিষ্ট সময়: বিকেলে, রান্নার সময়ের ব্যস্ততায় নয়, অভ্যাসে।
  • কনটেন্ট আগে বেছে রাখুন।
  • পাশে বসে কথা বলুন: "কী দেখলে? কোন চরিত্রটা ভালো লাগল?"

৫–৮ বছর

  • সময়ের একটা পারিবারিক চুক্তি করুন: স্কুলের দিনে কম, ছুটির দিনে একটু বেশি।
  • হোমওয়ার্ক বা বাইরের খেলা আগে, বিনোদনের স্ক্রিন পরে।
  • ঘুমের অন্তত ১ ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ।
  • খাওয়ার টেবিলে ও শোবার ঘরে নয়।

ধাপে ধাপে আপনার পরিবারের নিয়ম বানান

  1. এক সপ্তাহ মাপুন। সত্যি সত্যি কতক্ষণ দেখছে, লিখে রাখুন। অনেকেই প্রকৃত সংখ্যা দেখে অবাক হন।
  2. লক্ষ্য ঠিক করুন। একবারে ঝাঁপ নয়, বর্তমান থেকে ১০–১৫ মিনিট করে কমান।
  3. স্ক্রিন-মুক্ত সময় ও জায়গা নির্ধারণ করুন। খাবার টেবিল, শোবার ঘর, গাড়ি (অল্প কয়েকবার ছাড়া)।
  4. ঘরের সবাইকে জানান। দাদা-দাদি, সাহায্যকারী, বড় ভাইবোন সবাইকে।
  5. টাইমার ব্যবহার করুন। ঘড়ি "খারাপ লোক" হোক, আপনি নন।
  6. প্রতি মাসে পর্যালোচনা। কী কাজ করছে, কী বদলাতে হবে।

সংলাপের নমুনা

আপনি: "আজ আমরা ৩০ মিনিট কার্টুন দেখব। টাইমার বাজলে আমরা বন্ধ করব। ঠিক আছে?"

টাইমার বাজল, শিশু বলল: "আরেকটু!"

আপনি: "আমি জানি, আরও দেখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আজকের সময় শেষ। কাল আবার দেখব। এখন চলো, ঘুড়ি উড়িয়ে খেলি।"

নিয়ম পরিষ্কার, স্বর কোমল।

যা করবেন না

  • অন্যের শিশুর সাথে তুলনা করে নিজেকে বা শিশুকে দোষ দেবেন না।
  • সংখ্যাকে অতিরিক্ত ভয়ে পরিণত করবেন না। একদিন বেশি হয়ে গেলে ভুল ধরে নিজেকে শাস্তি দেবেন না।
  • স্ক্রিনকে পুরস্কার বা শাস্তি বানাবেন না।
  • "শিক্ষামূলক অ্যাপ" দেখেই অসীম সময় দেবেন না। সময়সীমা সবখানেই প্রযোজ্য।
  • ঘুমানোর আগে স্ক্রিন দেখতে দেবেন না।

কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

স্ক্রিন সীমা মানার পরও যদি শিশুর কথা বলা, মেলামেশা, ঘুম বা আচরণে স্পষ্ট পিছিয়ে থাকা বা অস্বাভাবিকতা দেখেন, তাহলে শিশু চিকিৎসক বা শিশু-বিকাশ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। স্ক্রিনই একমাত্র কারণ, এমন নাও হতে পারে। আমি নির্ণয় করি না, কিন্তু যে কোনো সন্দেহে জিজ্ঞেস করা ভালো।

সাধারণ প্রশ্ন

ডব্লিউএইচও কি সব ধরনের স্ক্রিনের কথা বলছে?

গাইডলাইনে মূলত বসে থাকা অবস্থায় বিনোদনের স্ক্রিন সময়ের কথা বলা হয়েছে। টিভি, ট্যাব ও ফোন সব ধরনই এর মধ্যে ধরা যায়।

অনলাইন ক্লাস স্ক্রিন সময়ে গুনব?

শিক্ষামূলক প্রয়োজনের স্ক্রিন আর বিনোদনের স্ক্রিন আলাদা করে ভাবুন। তবু মোট স্ক্রিন কমানো এবং বিরতি দেওয়া ভালো।

একদিন বেশি দেখে ফেললে কি বিপদ?

না। অসুস্থতা, ভ্রমণ বা বিশেষ দিনে ব্যতিক্রম হতেই পারে। ধারাবাহিক অভ্যাসটাই গুরুত্বপূর্ণ।

দুই বছরের নিচে হলে আমরা কি একবারও দেখাতে পারব না?

পরামর্শ হলো এড়িয়ে চলা। প্রয়োজন হলে খুব সংক্ষিপ্ত ও পাশে বসে হলে সেটা ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আপনার চিকিৎসকের মত নিন।

বাস্তবতা মেনে নিন

নিখুঁত নিয়ম মানা সব পরিবারের পক্ষে সবসময় সম্ভব নয়। কর্মজীবী মা-বাবা, যৌথ পরিবার, অসুস্থতা বা ভ্রমণ, জীবনের নানা পরিস্থিতিতে সীমা একটু ছাড়িয়ে যেতেই পারে। তখন নিজেকে দোষ না দিয়ে পরদিন আবার ধীরে ফিরে আসুন। লক্ষ্য হলো সামগ্রিক ধারা, প্রতিটি দিনের নিখুঁত হিসাব নয়। ছোট ছোট স্থায়ী পরিবর্তন বড় চমক ছাড়াই শিশুর অভ্যাসে পরিবর্তন আনে।

অন্যদের সাথে কথা বলুন

স্ক্রিন নিয়ে নিয়মগুলো আপনার পরিবারের বাইরেও পৌঁছে দিন। শিশুর স্কুল, প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের সাথে কথা বলে দেখুন, তারা কী করছেন। অন্য অভিভাবকদের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময় করলে নতুন ধারণা পাবেন, আর বুঝবেন যে আপনি একা এই চ্যালেঞ্জ সামলাচ্ছেন না। শিশুর যত্নকারী সবাই, যেমন দাদা-দাদি বা সাহায্যকারী, একই সীমা মানলে ঘরে ধারাবাহিকতা তৈরি হয় এবং শিশুর বিভ্রান্তি কমে।

🥣 মিস পিয়ার মূল কথা: "সংখ্যা একটা দিকনির্দেশ, বিচারক নয়। দুই বছরের নিচে স্ক্রিন নয়, দুই থেকে চার বছরে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা, আর বড় হলে সীমা, সঙ্গ ও ঘুমের ভারসাম্য। আজ একটা ছোট নিয়ম দিয়েই শুরু করুন।"

আরও পড়ুন