র, ড়, ঢ় উচ্চারণ ভুল: বাংলা উচ্চারণ ঠিক করার ঘরোয়া অনুশীলন

ফনিক্স ও ভাষা · 2026-10-08

"আমার মেয়ে 'রুটি'কে বলে 'লুটি', 'বড়'কে বলে 'বল'। সবাই হাসে, আমি বারবার ঠিক করে দিই, তবু ঠিক হয় না।" "ছেলেটা ৬ বছরের হলো, এখনো 'ক্লাস'কে 'কাস' বলে। কী করব?"

আপনার মনে হতে পারে, এই ভুল উচ্চারণ হয়তো আর কোনোদিন ঠিক হবে না। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি শিশুর ভাষা শেখার পথের একটি স্বাভাবিক ধাপ মাত্র।

দ্রুত উত্তর: র, ড়, ঢ় আর যুক্তবর্ণের মতো কঠিন ধ্বনি অনেক শিশু অন্য ধ্বনির চেয়ে দেরিতে আয়ত্ত করে, তাই ৪ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত কিছু ভুল উচ্চারণ প্রায়ই স্বাভাবিক। বারবার ধরে ধরে "ঠিক" করার চেয়ে নিজে সঠিক শব্দটি শান্তভাবে বলে দেখান, আর জিভ-মুখের খেলা ও ছড়ার অনুশীলন করান। অনেক দিন চেষ্টা করেও উন্নতি না হলে, বা কথা বোঝাই কঠিন হলে স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের পরামর্শ নিন।

কেন র, ড়, ঢ় এত কঠিন?

আমাদের মুখের ভেতরে জিভ, তালু, দাঁত আর ঠোঁট মিলে প্রতিটি ধ্বনি তৈরি হয়। কিছু ধ্বনি সহজ, যেমন "ম", "প", "ব"। আর কিছু ধ্বনিতে জিভকে তালুর কাছে নিখুঁতভাবে নাড়াতে হয়, যেমন "র", আর জিভের ডগা উল্টে দ্রুত ছুঁয়ে আসতে হয় "ড়" ও "ঢ়" বলার সময়। এই নড়াচড়া শিশুর জিভের পেশির জন্য জটিল। তাই সে তার চেনা সহজ ধ্বনি দিয়ে কাজ চালায়, যেমন "র"-এর জায়গায় "ল" বা "ড়"-এর জায়গায় "দ" বা "ল"।

একইভাবে "ক্লাস", "স্কুল", "প্রশ্ন" এর মতো যুক্তবর্ণে একসাথে দুটি ধ্বনি দ্রুত জুড়তে হয়। শিশু প্রথমে একটি ধ্বনি বাদ দিয়ে বলে, যেমন "স্কুল"কে "কুল"।

একটা কথা মনে রাখবেন, কোন বয়সে কোন ধ্বনি আয়ত্ত হবে, তার সময় আনুমানিক। সব শিশুর ক্ষেত্রে একই হয় না। কেউ ৪ বছরেই বেশিরভাগ ধ্বনি বলে ফেলে, কেউ ৬ বছর পর্যন্ত কয়েকটিতে আটকে থাকে। তাই সংখ্যা মিলিয়ে ভয় পাবেন না, বরং সন্তানের অগ্রগতির দিকটা দেখুন, আগের চেয়ে কি একটু ভালো হচ্ছে?

যে শিশু ছড়া ও গান শুনে বড় হয়, তার উচ্চারণের সুযোগ বেশি মেলে। এ নিয়ে আমি আগে ছড়া ও কথা ফোটার সম্পর্ক বিষয়ে একটি লেখা দিয়েছি। আর যারা দেরিতে কথা বলা শিশুর জন্য ঘরোয়া অনুশীলন খুঁজছেন, তাঁদের জন্যও আমার একটি আলাদা লেখা আছে।

ধাপে ধাপে ঘরোয়া অনুশীলন

ধাপ ১: আগে শুনুন, তারপর আদর্শ রূপটি শুনিয়ে দিন (Gentle Modelling)

শিশু যখন বলল, "মা, আমাকে লুটি দাও।" আপনি "ভুল!" বলে থামাবেন না। বরং সহজভাবে উত্তর দিন: "ও, তুমি রুটি খাবে? এই নাও গরম রুটি।" লক্ষ্য করুন, আপনি ভুল ধরেননি, কিন্তু সঠিক শব্দটি স্বাভাবিকভাবে দু-একবার শুনিয়ে দিয়েছেন। এটাকে বলে মডেলিং। শিশু শোনে, মনে রাখে, আর সময় হলে নিজেই চেষ্টা করে।

ধাপ ২: জিভ ও মুখের খেলা (Tongue-and-Mouth Play)

আয়নার সামনে মা-মেয়ে বা মা-ছেলে একসাথে বসুন। এগুলো খেলার মতো করুন, শাস্তি বা পরীক্ষার মতো নয়।

  • জিভ বের করে ডানে-বাঁয়ে নাড়ান: "দেখি, ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো!"
  • জিভ ওপরে-নিচে তুলুন: "লিফটে ওঠা-নামা।"
  • জিভ দিয়ে ঠোঁটের চারপাশ ঘুরিয়ে চাটুন: যেন ঠোঁটে মধু লেগেছে।
  • ওপরের দাঁতের পেছনে তালুতে জিভের ডগা ঠেকিয়ে "টক টক" আওয়াজ করুন: ঘোড়ার খুরের শব্দের মতো।
  • গাল ফুলিয়ে বাতাস ধরে রাখুন, তারপর ফুস করে ছাড়ুন।
  • মোটা সোজা খড় বা স্ট্র দিয়ে ফুঁ দিয়ে কাগজের টুকরো বা তুলা সরান।
  • মুখ বন্ধ রেখে "গরররর" করে বাঘের মতো গর্জন করুন: এতে জিভের ডগা কাঁপার অনুশীলন হয়।

প্রতিদিন ৫ মিনিট যথেষ্ট। হাসতে হাসতে করুন, কারণ আনন্দ ছাড়া এই অনুশীলন টেকে না।

ধাপ ৩: ধ্বনিকে আলাদা করে মজা দিয়ে শোনান

প্রথমে "র" যুক্ত শব্দ নিয়ে খেলুন, শিশুকে সঠিক করার জন্য চাপ না দিয়ে। আপনি শব্দগুলো বলুন আর শিশু চাইলে পুনরাবৃত্তি করবে:

  • র: রাজা, রং, রসগোল্লা, রেলগাড়ি, রুটি
  • ড়: বড়, ঘোড়া, পাখি-পড়া, গাড়ি-চড়া (শব্দের মাঝখানে ও শেষে বেশি আসে)
  • ঢ়: আষাঢ়, গূঢ়, দৃঢ় (শিশুর জন্য কঠিন, ধীরে ধীরে আসবে)

ছবি দেখিয়ে বা জিনিস দেখিয়ে শেখান। "ঘোড়া" বলার সময় ঘোড়ার খেলনা তুলে ধরুন।

ধাপ ৪: জিভের জড়তা ভাঙার ছড়া (Tongue-Twister Practice)

ছোট ছোট ছড়া ধীরে ধীরে বলুন, তারপর একটু দ্রুত করুন। ভুল হলে হাসুন, থামাবেন না।

  • "বড় বড় ঘোড়া ছুটে যায় দৌড়ে।"
  • "রাজা রামের রথ রাস্তায় ছোটে।"
  • "রং-বেরঙের রসগোল্লা, রসে ভরা রসের গোল্লা।"
  • "পাখি পড়ে পড়ে ঘুমায় গাছের ডালে।"
  • "চার চোর চুরি করে চালতা চুরি করে চম্পট।"

এই ছড়াগুলো বানিয়ে নিজেরাও লিখে ফেলতে পারেন। নিজের সন্তানের নাম আর পছন্দের জিনিস মিলিয়ে বানানো ছড়া শিশুরা বেশি পছন্দ করে।

ধাপ ৫: যুক্তবর্ণে ধীরে ধীরে যান

"স্কুল" শব্দটিকে ভাঙুন: স্‌-কুল। প্রথমে ধীরে ধীরে খণ্ড করে বলুন, তারপর জুড়ে দিন। হাততালি দিয়ে ছন্দ ধরুন: স্কুল (দুই তালি)। "ক্লাস", "গ্রাম", "প্রশ্ন", "ব্রেড", এভাবে একটি একটি করে শব্দ নিন। একদিনে অনেক শব্দ নয়।

ধাপ ৬: পড়া ও গল্পের সময় ছড়াকে সঙ্গী করুন

প্রতিদিনের গল্পের সময়ে ছন্দময় ছড়ার বই পড়ুন। শিশুর কান ধীরে ধীরে সঠিক উচ্চারণের সাথে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। যে শিশুরা ঘরে মা-বাবার সাথে অনেক কথা বলে, তাদের ক্ষেত্রে এই উন্নতি সাধারণত আরও দ্রুত দেখা যায়।

নমুনা কথোপকথন

শিশু: "মা, আমি লুটি খাব।" আপনি: "ও, রুটি খাবে? রুটি তো খুব মজার। ডাল দিয়ে খাবে, না সবজি দিয়ে?" শিশু: "লুটি আর ডাল।" আপনি: "চমৎকার। রুটি আর ডাল। এই নাও।"

লক্ষ্য করুন, এখানে কোনো ধমক নেই, "বলো রুটি" বলে জোর করা নেই। কিন্তু সঠিক শব্দটি আপনি তিনবার স্বাভাবিকভাবে শুনিয়ে দিয়েছেন।

যখন শিশু নিজে বুঝে ফেলে: শিশু: "মা, আমি র-র-রুটি বলতে পারছি!" আপনি: "বাহ, আমি শুনেছি! তুমি চেষ্টা করেছ, আমার খুব ভালো লাগছে।"

যা করবেন না

  • কখনোই শিশুর উচ্চারণ নিয়ে হাসাহাসি করবেন না। মজা করে অন্যদের সামনে নকল করা তো একেবারেই নয়। এতে শিশু লজ্জা পায় আর কথা বলাই কমিয়ে দিতে পারে।
  • "ঠিক করে বলো!" বলে বারবার থামাবেন না।
  • কথা বলার সময় একটু পরপর শুধরে দেবেন না, এতে কথা বলার আনন্দ নষ্ট হয়।
  • ভাইবোন বা বন্ধুর সাথে তুলনা করবেন না।
  • জিভ ধরে টানাটানি বা মুখের ভেতর আঙুল ঢোকানোর মতো কিছু করবেন না।
  • নিজে নিজে "জিভের নিচের চামড়া কাটতে হবে" ধরনের সিদ্ধান্ত নেবেন না। এ বিষয়ে শুধু যোগ্য চিকিৎসক বা থেরাপিস্ট বলতে পারেন।
  • "বাচ্চা ভাষায়" নিজে কথা বললে শিশু সেটাই শিখবে। আপনি স্পষ্ট, সহজ বাংলায় কথা বলুন।

কখন স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের কাছে যাবেন

অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘরোয়া অনুশীলনে ধীরে ধীরে উন্নতি হয়। তবে নিচের লক্ষণ থাকলে দেরি না করে একজন স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট বা শিশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:

  • পরিচিত মানুষও শিশুর বেশিরভাগ কথা বুঝতে পারেন না।
  • অনেক মাস অনুশীলনের পরও কোনো উন্নতি নেই।
  • অনেকগুলো ধ্বনি একসাথে ভুল হচ্ছে, শুধু দু-একটি নয়।
  • শিশু নিজের কথা না বোঝায় রেগে যায়, গুটিয়ে যায় বা কথা বলতে চায় না।
  • বয়স ৬ বা ৭ পেরিয়েছে, তবু অনেক ধ্বনি ঠিক হচ্ছে না।
  • কথা বলার সময় বারবার আটকে যায়, একই অক্ষর বারবার বলে (তোতলানোর মতো মনে হলে)।
  • শুনতে অসুবিধা আছে বলে সন্দেহ হয়।
  • আগে যা পারত, হঠাৎ তা হারিয়ে ফেলেছে।

আমি একজন শিক্ষিকা। আমি কোনো রোগ নির্ণয় করি না, চিকিৎসাও দিই না। বিশেষজ্ঞ শিশুকে সরাসরি দেখে বলতে পারবেন, সমস্যা কী আর কীভাবে সাহায্য করা যায়। আগে দেখালে ক্ষতির কিছু নেই, বরং দুশ্চিন্তা কমে।

প্রতিদিনের ছোট রুটিন, যেটা সহজে মানা যায়

  • সকালে ব্রাশ করার পর ২ মিনিট আয়নার সামনে জিভের খেলা।
  • বিকেলে একটি ছোট ছড়া বা জিভের জড়তা ভাঙার ছড়া ২-৩ বার।
  • রাতে ঘুমের আগে একটি ছড়ার বা গল্পের বই।

এই তিনটি জিনিস নিয়মিত হলেই যথেষ্ট। বড় ম্যারাথন নয়, ছোট ছোট নিয়মিত পদক্ষেপই কাজ করে।

সাধারণ প্রশ্ন

আমার সন্তান ৫ বছরেও 'র'কে 'ল' বলে। কি চিন্তার কারণ?

এটি অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই দেখা যায় এবং বয়স বাড়ার সাথে ঠিক হয়ে যেতে পারে। তবে ৬ বছরের কাছাকাছি গিয়েও যদি কোনো উন্নতি না দেখেন, অথবা আরও ধ্বনি ভুল হয়, তাহলে একবার থেরাপিস্টকে দেখিয়ে নিন।

ভুল উচ্চারণ কি টিভি-মোবাইলের কারণে হয়?

সরাসরি এমন কথা বলা যায় না। তবে ঘরে মা-বাবার সাথে মুখোমুখি কথা বলার সুযোগ কমে গেলে শিশুর ভাষা অনুশীলন কমে যায়। তাই স্ক্রিন সীমিত রেখে গল্প, ছড়া আর আলাপ বাড়ান।

শিশুকে বারবার সংশোধন করলে কি তুতলাবে?

আমি এমন কোনো দাবি করছি না। তবে বারবার থামালে কথা বলার ভয় বা সংকোচ তৈরি হতে পারে, যা কথায় আত্মবিশ্বাস কমায়। তাই নরম ভাবে সঠিক রূপটি শুনিয়ে দেওয়াই ভালো।

ইংরেজি স্কুলে পড়ে, বাংলা উচ্চারণ কি এতে প্রভাবিত হয়?

দুই ভাষা একসাথে শিখলে কখনো কখনো ধ্বনি মিশে যেতে পারে। এটা অস্বাভাবিক নয়। ঘরে বাংলায় গল্প, ছড়া আর কথাবার্তা বাড়ালে মাতৃভাষার ভিত শক্ত থাকে।


🗣️ মিস পিয়ার মূল কথা: "ভুল উচ্চারণ লজ্জার নয়, শেখার পথের একটি ধাপ। ধমক নয়, মজার ছড়া আর ভালোবাসায় শিশুর জিভ ধীরে ধীরে সঠিক ধ্বনিতে পৌঁছে যায়। শিশুর কথা বলার আনন্দ আগলে রাখুন, বাকিটা সময় ঠিক করে দেবে।"

আরও পড়ুন