শিশুর উচ্চারণের ভুল: কোনটা স্বাভাবিক, কখন স্পিচ থেরাপিস্ট বা ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?

ফনিক্স ও ভাষা · 2026-10-08

"আমার ছেলে পাঁচ বছরের, তবু 'রুটি' বলতে গিয়ে 'লুটি' বলে। সবাই হাসে, কিন্তু আমার ভয় লাগে, ঠিক হবে তো?" "মেয়ে 'শালিক'কে বলে 'সালিক'। স্কুলে গেলে কি বন্ধুরা ক্ষেপাবে?"

দ্রুত উত্তর: ছোটবেলায় কিছু ধ্বনি ভুল উচ্চারণ করা খুবই সাধারণ। কঠিন ধ্বনি (যেমন র, শ, স, জ, যুক্তাক্ষর) শিশুরা ধীরে ধীরে আয়ত্ত করে। তবে বয়স বাড়ার সাথে অগ্রগতি না দেখা গেলে, অন্যরা শিশুর কথা প্রায় বুঝতেই না পারলে, কিংবা শোনার সমস্যার সন্দেহ হলে শিশু চিকিৎসক বা স্পিচ থেরাপিস্টের পরামর্শ নিন। এই লেখা কোনো রোগ নির্ণয় নয়, শুধু একটি সাধারণ দিকনির্দেশনা।

আমি জাফরানা সুলতানা, সবাই আমাকে মিস পিয়া ডাকে। শিশুর কথা শিখতে সময় লাগে, আর এই পথে অভিভাবকের দুশ্চিন্তা একেবারেই স্বাভাবিক। আপনি দোষী নন, আপনার সন্তানও "খারাপ" নয়। আজ আমরা দেখব কোন ভুলগুলো সময়ের সাথে নিজে থেকেই মিটে যায়, আর কোন লক্ষণে অপেক্ষা না করে বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলা ভালো।

শিশুরা কেন ধ্বনি ভুল উচ্চারণ করে?

কথা বলতে জিভ, ঠোঁট, দাঁত, তালু আর শ্বাস, সবকিছুর সূক্ষ্ম সমন্বয় লাগে। ছোট শিশুর মুখের পেশি এখনো অনুশীলনের মধ্যে আছে। তাই সে নিজের মতো করে কঠিন ধ্বনিকে সহজ করে নেয়।

বাংলায় এমন সহজ করে নেওয়ার কিছু পরিচিত উদাহরণ:

শিশু বলেআসলে বলতে চায়কী ঘটছে
লুটিরুটির-এর জায়গায় ল
সালিকশালিকশ-এর জায়গায় স
তাকাটাকামূর্ধন্য ধ্বনিকে দন্ত্য করা
আতিবাতিশুরুর ধ্বনি বাদ দেওয়া
কলম-এর জায়গায় "কম"কলমযুক্ত বা কঠিন ধ্বনি এড়ানো

শিশুর কান ঠিক শুনতে পায়, কিন্তু মুখ এখনো ঠিকমতো বানাতে পারে না। এটাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আসল কারণ। তাই একে "আদর করে ভুল" মনে করে হাসাহাসি করার চেয়ে শিশুর চেষ্টাকে সম্মান করা জরুরি।

বয়স অনুযায়ী কী প্রত্যাশা করা যায়?

নিচের ধারণা একেবারে সাধারণ ও মোটামুটি। প্রতিটি শিশু আলাদা গতিতে এগোয়, তাই এটাকে কঠোর মাপকাঠি ভাববেন না।

  • ২ থেকে ৩ বছর: পরিচিত মানুষ শিশুর অনেক কথা বোঝে, কিন্তু অচেনা কেউ হয়তো অর্ধেক বোঝে। অনেক ধ্বনি বাদ পড়া বা বদলে যাওয়া স্বাভাবিক।
  • ৩ থেকে ৪ বছর: কথা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়। প্রিয়জন ছাড়াও অন্যরা বেশিরভাগ কথা ধরতে পারে। র, শ, স, যুক্তাক্ষরে তখনো ভুল হতে পারে।
  • ৫ বছর: বেশিরভাগ কথা পরিষ্কার হয়ে আসে। দু-একটি কঠিন ধ্বনি (বিশেষ করে র বা যুক্তাক্ষর) নিয়ে এখনো চেষ্টা চলতে পারে।
  • ৬ থেকে ৭ বছর: অধিকাংশ শিশু প্রায় সব ধ্বনি ঠিক করে বলতে শুরু করে। কোনো ধ্বনি তখনো আটকে থাকলে বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলার ভালো সময়।

মনে রাখবেন, "অধিকাংশ" মানে সবাই নয়। কেউ দ্রুত, কেউ ধীরে এগোয়। তাই আপনার সন্তানের নিজের অগ্রগতির দিকে তাকান, প্রতিবেশীর সন্তানের সাথে মেলাবেন না।

কোন লক্ষণ দেখলে ডাক্তার বা স্পিচ থেরাপিস্টের পরামর্শ নেবেন?

নিচের লক্ষণগুলো থাকলে অপেক্ষা না করে শিশু চিকিৎসক বা স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের সাথে কথা বলুন। কারণ কিছু ক্ষেত্রে আগে ধরা পড়লে সাহায্য সহজ হয়।

  • বয়স বাড়ছে কিন্তু কয়েক মাসেও কথা স্পষ্ট হওয়ার কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
  • ঘরের বাইরের মানুষ শিশুর বেশিরভাগ কথাই বুঝতে পারছে না, বিশেষ করে চার-পাঁচ বছরের পর।
  • শিশু ডাকলে সাড়া দেয় না, বা টিভির আওয়াজ খুব বাড়িয়ে শোনে। এমন হলে আগে শোনার পরীক্ষা করানো দরকার হতে পারে।
  • ঘনঘন কান ব্যথা বা কান পাকার ইতিহাস আছে।
  • খাওয়ার সময় চিবোতে বা গিলতে অসুবিধা হয়, অথবা মুখ দিয়ে লালা বেশি ঝরে।
  • আগে যে শব্দ বলত, এখন সেগুলো বলা বন্ধ করে দিয়েছে (অর্থাৎ পিছিয়ে যাচ্ছে)।
  • কথা বলতে গিয়ে শিশু বিরক্ত, মনমরা বা কথা বলা এড়িয়ে চলছে।
  • দুই বছরের কাছাকাছি এসেও খুব কম শব্দ বলছে। (এ নিয়ে আমার আলাদা লেখা আছে, নিচে লিংক দিয়েছি।)

এর কোনোটা থাকা মানেই বড় সমস্যা নয়। এগুলো শুধু একটি সংকেত যে, একজন বিশেষজ্ঞের চোখে একবার দেখিয়ে নেওয়া ভালো। রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত ডাক্তার ও থেরাপিস্টের কাজ, আমার নয়।

আমি কি ভুল শুধরে দেব, নাকি এড়িয়ে যাব?

এটাই অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় দ্বিধা। আমার পরামর্শ: সরাসরি ভুল ধরবেন না, বরং সঠিক রূপটি স্বাভাবিকভাবে ফিরিয়ে বলুন। একে বলে রিফ্রেজিং বা ঘুরিয়ে বলা।

শিশু: "মা, আমাকে লুটি দাও।" আপনি: "ও, তুমি রুটি খাবে? আচ্ছা, রুটি দিচ্ছি। রুটি গরম আছে।"

এখানে "না, ভুল!" বলা হলো না, শিশুকে বারবার বলতেও বাধ্য করা হলো না। শুধু সঠিক ধ্বনিটা কয়েকবার তার কানে পৌঁছে গেল। কানে যত বেশি সঠিক রূপ আসে, মুখ ততই সেদিকে এগোয়।

যা করবেন না:

  • "বলো তো রুটি, রু-টি!" বলে বারবার জোর করবেন না। এতে শিশু লজ্জা পেয়ে কথাই কমিয়ে দিতে পারে।
  • অন্যদের সামনে শিশুর ভুল নকল করে হাসবেন না।
  • বাচ্চা-বাচ্চা ভুল ভাষায় আদর করে উত্তর দেবেন না। পরিষ্কার, স্বাভাবিক কথায় সাড়া দিন।

ঘরে কোন খেলা মুখের পেশি ও ধ্বনি সচেতনতা বাড়ায়?

সরাসরি উচ্চারণ ঠিক করার চাপ না দিয়ে খেলার ছলে মুখের ব্যায়াম আর শোনার অভ্যাস বাড়ানো যায়। প্রতিটি খেলা ২ থেকে ৫ মিনিটের বেশি নয়।

  1. ফুঁ দেওয়ার খেলা: তুলোর বল বা কাগজের টুকরো ফুঁ দিয়ে টেবিলের এপার-ওপার পাঠান। এতে ঠোঁট আর শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে।
  2. জিভ দিয়ে খেলা: আয়নার সামনে জিভ উপরে-নিচে, ডানে-বাঁয়ে নাড়ান। মজা করে "জিভ দিয়ে নাক ছোঁয়ার চেষ্টা" করুন।
  3. পশুর ডাক: ঘোড়ার টগবগ, সাপের হিস-স-স, বিড়ালের মিউ। এতে নানা ধ্বনি খেলার মধ্যে আসে।
  4. ছড়া ও গান: একই ধ্বনি বারবার ফেরে এমন ছড়া শোনান। এ নিয়ে আমার ছড়ার লেখাটি দেখতে পারেন।
  5. শুনে ধরার খেলা: "আমি বলছি 'কল' আর 'ফল', কোনটা খাওয়া যায়?" শুনে পার্থক্য ধরার অভ্যাস তৈরি হয়।

শিশু কথা বলার সময় আটকে গেলে বা তোতলালে?

ছোট বয়সে কথা বলার সময় একই শব্দ বা অংশ কয়েকবার বলা, থেমে যাওয়া বা শব্দ খুঁজে না পাওয়া অনেক শিশুর মধ্যে দেখা যায়, বিশেষ করে যখন ভাবনা মুখের চেয়ে দ্রুত চলে। এটা সবসময় উচ্চারণের ভুল নয়, আলাদা বিষয়। সময়, চাপ আর অভিভাবকের প্রতিক্রিয়া এখানে বড় ভূমিকা রাখে।

শিশুর কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে শুনুন। "আস্তে বলো", "নিঃশ্বাস নাও", "আবার বলো" জাতীয় কথা এড়িয়ে চলুন। যদি এটি অনেক সপ্তাহ ধরে চলে, বাড়ছে বলে মনে হয়, অথবা শিশু কষ্ট পেয়ে যায়, তাহলে চিকিৎসক বা থেরাপিস্টের পরামর্শ নিন। বিস্তারিত পরামর্শ আমার আলাদা লেখায় আছে।

থেরাপিস্টের কাছে গেলে কী হয়?

অনেকে ভয় পান, "থেরাপি" শুনলেই বুঝি বড় কিছু ধরা পড়েছে। বাস্তবে প্রথম সাক্ষাতে সাধারণত শিশুর সাথে খেলা, ছবির বই দেখা, কথা শোনা আর আপনার কাছে ইতিহাস জানা হয়। মুখের গঠন ও শ্রবণ দেখা হয়। তারপর বিশেষজ্ঞ বলেন শিশুর অবস্থা কী, ঘরে কী করতে হবে, আর আদৌ নিয়মিত থেরাপি দরকার কি না। অনেক সময় শুধু কিছু ঘরোয়া খেলার পরামর্শ নিয়েই ফিরে আসা যায়।

প্রথম যাওয়ার আগে লিখে রাখুন: কখন থেকে সমস্যা মনে হচ্ছে, কোন ধ্বনিগুলো ভুল হচ্ছে, কানের কোনো সমস্যা হয়েছে কি না, আর পরিবারে কথা বলার সমস্যার ইতিহাস আছে কি না। সম্ভব হলে শিশুর স্বাভাবিক কথা মোবাইলে অল্প রেকর্ড করে নিন।

সাধারণ প্রশ্ন

দুই ভাষায় কথা শুনলে কি উচ্চারণ দেরিতে ঠিক হয়? দুই ভাষার পরিবেশে বড় হওয়াই নিজে উচ্চারণের সমস্যার কারণ নয়। কখনো শব্দভান্ডার দুই ভাষায় ভাগ হয়ে যায়, তাই এক ভাষায় শব্দ কম মনে হতে পারে। ভাষা মেশানো নিয়ে আমার আলাদা একটি লেখা আছে।

তোতলামি আর উচ্চারণের ভুল কি একই? না, দুটি আলাদা বিষয়। উচ্চারণের ভুলে ধ্বনি বদলে যায় বা বাদ পড়ে, আর তোতলামিতে কথার প্রবাহ আটকে যায় বা পুনরাবৃত্তি হয়। সন্দেহ হলে বিশেষজ্ঞকে দেখান।

স্কুলের বন্ধুরা ক্ষেপালে কী করব? শিশুকে বলুন, "তোমার কথা বুঝতে সবার একটু সময় লাগছে, তুমি চেষ্টা করছ, এটাই ভালো।" শিক্ষিকাকেও জানিয়ে রাখুন, যেন তিনি ক্লাসে সহানুভূতির পরিবেশ রাখেন।


🗣️ মিস পিয়ার মূল কথা: 🌼 "ছোট্ট মুখ এখনো শিখছে। সঠিক রূপটা কানে পৌঁছে দিন, ভুলের জন্য লজ্জা দেবেন না। আর মনে সন্দেহ জাগলে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস করুন, সেটা সচেতন অভিভাবকের কাজ, দুর্বলতা নয়।"

আরও দেখতে পারেন: দুই বছর বয়সে কয়টি শব্দ বলা উচিত? মাইলস্টোন চার্ট, কথা বলতে দেরি হলে ঘরোয়া অনুশীলন, ছড়া শুনলে শিশুর কথা ফোটে কেন, শিশুর তোতলানো ও কথার জড়তা।

আরও পড়ুন