বাচ্চা ২ বছরেও কথা বলছে না: শিশু চিকিৎসকের কাছে কখন যাবেন? (রেড ফ্ল্যাগ চেকলিস্ট)

ফনিক্স ও ভাষা · 2026-10-08

"ভাবি, কাল থেকে বলবে। কিন্তু দুই বছর পার হয়ে গেল, এখনো শুধু 'আ-আ' করে আঙুল দিয়ে দেখায়।" "সবাই বলে, ছেলেরা দেরিতে কথা বলে। কিন্তু রাতে ঘুম আসে না, মনে হয় আমি কিছু মিস করছি না তো?"

দ্রুত উত্তর: প্রতিটি শিশু আলাদা, তবে সাধারণ একটা দিকনির্দেশ হলো: ১২ মাসের মধ্যে বকবক শব্দ না করা, ১৬ মাসের মধ্যে একটিও অর্থপূর্ণ শব্দ না বলা, ২৪ মাসের মধ্যে দুই শব্দ জুড়ে না বলা, অথবা আগে শেখা কথা বা দক্ষতা হারিয়ে ফেলা দেখলে অপেক্ষা না করে শিশু চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন। নাম ধরে ডাকলে বা শব্দে সাড়া না দিলে আরও দ্রুত দেখান।

আমি শিক্ষিকা জাফরানা সুলতানা, সবাই আমাকে মিস পিয়া বলে ডাকে। আমার কাছে প্রতি সপ্তাহে অনেক মা এই প্রশ্নটা নিয়ে আসেন। প্রথমেই একটা কথা বলে রাখি: আপনি এই লেখা পড়ছেন মানে আপনি সচেতন একজন মা বা বাবা। সন্তানের জন্য এই সচেতনতাটাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমি চিকিৎসক নই, তাই এখানে কোনো রোগ নির্ণয় করব না। আমি শুধু সাধারণ কিছু সূচক, আর ঘরে কী করা যায়, সেটুকু সহজ করে বলব।

কথা বলার যাত্রাটা আসলে কেমন?

কথা বলা শুরু হয় শব্দ বলার অনেক আগে থেকে। শিশু প্রথমে আপনার মুখের দিকে তাকায়, হাসে, শব্দ শুনে ঘাড় ঘোরায়। তারপর "আ-আ", "বা-বা", "মা-মা" ধরনের বকবক শুরু করে। এরপর আঙুল তুলে দেখায়, হাত নেড়ে টা-টা করে, মাথা নেড়ে "না" বলে। তারপর আসে প্রথম শব্দ, তারপর ধীরে ধীরে শব্দের ভাণ্ডার বাড়ে, আর একদিন দুই শব্দ জুড়ে বলে, "মা ভাত", "বাবা যাব"।

এই পুরো যাত্রায় কথা বলা হলো শেষ ধাপ। তার আগে দরকার শোনা, বোঝা, তাকানো, ইশারা করা আর অনুকরণ করা। তাই শুধু "কয়টা শব্দ বলে" গুনলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকে। শিশু কতটা বোঝে, কতটা যোগাযোগ করতে চায়, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কেন দেরি না করে খোঁজ নেওয়া ভালো?

ছোট বয়সে শিশুর মস্তিষ্ক নতুন জিনিস খুব দ্রুত শেখে। তাই কোনো সহায়তা লাগলে সেটা যত আগে শুরু হয়, শিশুর জন্য তত সহজ হয়। অন্যদিকে, "দেখি আরেকটু বড় হোক" বলে অপেক্ষা করলে মূল্যবান সময় চলে যেতে পারে। আবার এর মানে এই নয় যে দেরিতে কথা বলা মানেই বড় কোনো সমস্যা। অনেক শিশু কিছুটা দেরিতে শুরু করে এবং পরে ঠিকই ধরে ফেলে। কিন্তু সেটা নিশ্চিত করতে পারেন একজন বিশেষজ্ঞ, আমি বা প্রতিবেশী নই। তাই আমার পরামর্শ হলো: সন্দেহ হলে খোঁজ নিন। খোঁজ নিয়ে সব ঠিক পাওয়াটা সবচেয়ে ভালো খবর।

মনে রাখবেন, কথা দেরিতে আসার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। শোনার সমস্যা হতে পারে, ভাষা বিকাশে ধীরগতি হতে পারে, আবার অন্য কিছুও হতে পারে। কোনটা সেটা শুধু পরীক্ষার পরেই বলা সম্ভব। তাই আমি কোনো একটা কারণকে দায়ী করব না, আপনিও নিজেকে দায়ী করবেন না।

রেড ফ্ল্যাগ চেকলিস্ট: এই লক্ষণগুলো দেখলে দেরি করবেন না

নিচের তালিকাটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত দিকনির্দেশ। এটি কোনো পরীক্ষা নয়, আর প্রতিটি শিশুর বিকাশের গতি আলাদা। এক বা একাধিক লক্ষণ মিললে শিশু চিকিৎসকের সাথে সময় নিন।

বয়স অনুযায়ী সূচক

  • প্রায় ১২ মাসে: কোনো বকবক নেই, ইশারা করে না (যেমন হাত নেড়ে টা-টা, আঙুল তুলে দেখানো), বা আপনার দিকে তাকিয়ে সাড়া দেয় না।
  • প্রায় ১৬ মাসে: একটিও অর্থপূর্ণ শব্দ বলে না (মা, বাবা, পানি, দে, এই ধরনের)।
  • প্রায় ২৪ মাসে: দুই শব্দ জুড়ে বলে না, বা মোট শব্দ খুব কম, আর পরিচিত সহজ নির্দেশ (যেমন "বলটা দাও") বোঝে না।
  • যেকোনো বয়সে: আগে যা বলত বা করত, সেই কথা বা দক্ষতা হারিয়ে ফেলা। এটি দেখলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।

শোনা ও সাড়া দেওয়ার লক্ষণ

  • নাম ধরে ডাকলে ঘুরে তাকায় না, বিশেষ করে আপনি যখন তার পেছন থেকে ডাকেন।
  • জোরে শব্দ হলে চমকায় না, বা পরিচিত শব্দে (দরজার ঘণ্টা, পরিচিত গান) কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
  • বারবার কানের সংক্রমণ হয়েছে, বা কান থেকে পানি বা পুঁজ পড়ে।

যোগাযোগ ও আচরণের লক্ষণ

  • চোখে চোখ রাখা খুব কম, বা আপনার হাসিতে হাসি ফেরত দেয় না।
  • কোনো কিছু চাইলে আপনার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়, কিন্তু আঙুল দিয়ে দেখায় না বা শব্দ করে চায় না।
  • অনুকরণ করে না: আপনি হাত তালি দিলে সে দেয় না, মুখ ভেংচালে ফেরত দেয় না।
  • খেলার সময় একই কাজ বারবার করে এবং আপনি যোগ দিলে বিরক্ত হয়।

এই শেষ দুটি তালিকার লক্ষণ দেখলে ঘাবড়ে যাবেন না, আবার অবহেলাও করবেন না। একটি লক্ষণ মানেই কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা নয়। চিকিৎসক সামগ্রিক চিত্র দেখে বলবেন।

কার কাছে যাবেন?

অনেক মা এখানেই আটকে যান। কোথায় যাব, কার কাছে যাব? একটা সহজ ক্রম বলি:

  1. শিশু চিকিৎসক: প্রথম ধাপ। তিনি সামগ্রিক বিকাশ দেখবেন এবং প্রয়োজনে কাকে দেখাতে হবে বলবেন।
  2. অডিওলজিস্ট (শ্রবণ পরীক্ষা): শোনার ক্ষমতা পরীক্ষা করা খুব জরুরি। কারণ শিশু ঠিকমতো না শুনলে কথা শেখা কঠিন হয়। এই পরীক্ষা ছোট শিশুদের জন্যও করা যায়।
  3. স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট: ভাষা ও কথা বিকাশের মূল্যায়ন করেন এবং ঘরে কী কী করবেন তার পরিকল্পনা দেন।
  4. শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞ: প্রয়োজন মনে করলে চিকিৎসক এঁর কাছে পাঠাবেন।

ঢাকা বা বড় শহরে এই সুবিধা তুলনামূলক সহজ। ছোট শহর বা গ্রামে থাকলে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে শিশু বিভাগে শুরু করুন, তাঁরাই পরের ধাপ বলে দেবেন।

ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে কী গুছিয়ে নেবেন?

ডাক্তারের চেম্বারে অল্প সময়ে অনেক কিছু বলতে হয়, আর তখন মায়েরা ভুলে যান। আগে থেকে এই কথাগুলো লিখে রাখুন:

  • শিশুর বয়স এবং জন্মের সময়কার কোনো বিশেষ ঘটনা।
  • কবে কী শব্দ বলেছে, কোন শব্দ এখন আর বলে না।
  • বাড়িতে কোন কোন ভাষায় কথা হয়।
  • বারবার কানের সমস্যা বা জ্বর হয়েছে কি না।
  • সবচেয়ে ভালো হয় যদি ১০ থেকে ২০ সেকেন্ডের একটা ভিডিও তোলা থাকে, যেখানে শিশু খেলছে বা আপনার সাথে যোগাযোগ করছে। চেম্বারে অনেক শিশু অচেনা পরিবেশে চুপ হয়ে যায়।

ঘরে এখন যা করবেন

বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার অপেক্ষার সময়েও, এমনকি সব ঠিক থাকলেও, এই কাজগুলো শিশুর ভাষা বিকাশে সাহায্য করে। কোনোটাই কঠিন নয়।

  • মুখোমুখি বসুন। শিশুর চোখের উচ্চতায় নেমে কথা বলুন, যাতে সে আপনার মুখ ও ঠোঁট দেখতে পায়।
  • নিজের কাজের ধারাবিবরণী দিন। "আমি পেঁয়াজ কাটছি। এবার তেলে দিচ্ছি। শব্দ হচ্ছে ছ্যাঁ-ছ্যাঁ।" ছোট ছোট বাক্যে বলুন।
  • শিশু যা বলে, তার সাথে একটু যোগ করুন। সে "পানি" বললে আপনি বলুন, "হ্যাঁ, পানি চাই? ঠান্ডা পানি।"
  • অপেক্ষা করুন। প্রশ্ন করে ৫ থেকে ৭ সেকেন্ড চুপ করে থাকুন। অনেক সময় আমরা উত্তরের আগেই নিজে বলে দিই।
  • পছন্দ দিন। "ভাত নেবে, না রুটি?" বলে দুটি জিনিস দেখিয়ে জিজ্ঞেস করুন। আঙুল দিয়ে দেখালেও সাড়া দিন এবং শব্দটা আপনি বলে দিন।
  • ছবির বই দেখুন। রোজ ১০ মিনিট। পশুর ডাক, পরিচিত জিনিসের নাম, ছবি দেখিয়ে আঙুল রাখা।
  • গান ও ছড়া। "আয় আয় চাঁদ মামা", "টুনটুনি পাখি", ছড়ার সাথে হাতের ভঙ্গি করুন।
  • পরিচিত রুটিনে একই শব্দ ব্যবহার করুন। গোসলের সময় "পানি, সাবান, মুছি", খাওয়ার সময় "ভাত, ডাল, মাছ"। বারবার একই শব্দ শুনলে শেখা সহজ হয়।
  • ইশারাকে স্বাগত জানান। ইশারা শিশুকে কথা বলা থেকে দূরে সরায় না, বরং যোগাযোগের আগ্রহ ধরে রাখে।

আমার আগের একটি লেখায় দেরিতে কথা বলা শিশুর জন্য ঘরোয়া অনুশীলনের আরও কিছু খেলা দিয়েছি। আর স্ক্রিন কমানোর বিষয়ে আলাদা একটি লেখাও আছে। সেগুলো পড়ে দেখতে পারেন।

একটি নমুনা কথোপকথন

ধরুন, দুই বছরের রিফাত আপনার হাত টেনে ফ্রিজের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

আপনি (হাঁটু গেড়ে বসে): "ও, তুমি কিছু চাও। কী চাও? এটা?" (পানির বোতল দেখিয়ে) রিফাত: "আ... আ..." (আঙুল তোলে) আপনি: "পানি! তুমি পানি চাও। পা-নি। নাও, পানি।" (একটু থেমে) "আবার বলো, পানি?" রিফাত: "পা..." আপনি: "হ্যাঁ! পা-নি! খুব ভালো বলেছ।"

এখানে লক্ষ করুন, আপনি জোর করেননি, ভুল ধরেননি। শুধু শব্দটা সুন্দর করে শুনিয়েছেন এবং সামান্য চেষ্টাকেও আনন্দের সাথে স্বীকার করেছেন।

যা করবেন না

  • তুলনা করবেন না। "পাশের বাসার বাচ্চা তো এই বয়সে গড়গড় করে কথা বলে", এই কথা মা এবং শিশু, দুজনকেই কষ্ট দেয়।
  • জোর করে বলাবেন না। "বলো তো, বলো, বলো!" বলে চাপ দিলে শিশু আরও গুটিয়ে যেতে পারে।
  • ভুল ধরে বারবার শুধরাবেন না। আপনি শুধু ঠিক রূপটা শান্তভাবে বলে দিন।
  • শুধু অপেক্ষা করে সময় কাটাবেন না। "ও ঠিক হয়ে যাবে" ভেবে লক্ষণ এড়িয়ে গেলে সহায়তার সুযোগ পেছাতে পারে।
  • নিজেকে দোষ দেবেন না। কারণ জানা না থাকলে নিজেকে দায়ী করা অন্যায়। আমি স্ক্রিন বা অন্য কোনো একটিকে নিশ্চিত কারণ বলছি না। বিষয়টি জটিল, আর প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে আলাদা।
  • অপ্রমাণিত ঘরোয়া চিকিৎসা বা "জাদুকরী" ওষুধের পেছনে ছুটবেন না। যিনি দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন, তাঁকে সাবধানে বিচার করুন।

বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষা শুনলে কি দেরি হয়?

অনেক পরিবারে এই ভয় থাকে। দুই ভাষা শুনলেও শিশু ভাষা শেখে, তবে তার শব্দ দুই ভাষায় ভাগ হয়ে যায়, তাই এক ভাষায় গুনলে শব্দ কম মনে হতে পারে। দুই ভাষার শব্দ মিলিয়ে মোট শব্দ ধরুন। তবে সন্দেহ থাকলে একই পরামর্শ: বিশেষজ্ঞকে দেখান। দ্বিভাষিক শিশুর বিষয়ে আমার আলাদা একটি লেখা আছে, সেটি পড়তে পারেন।

কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন: সংক্ষেপে মনে রাখার সারাংশ

  • আগে শেখা কথা বা দক্ষতা হারালে: দেরি না করে যান।
  • নাম ধরে ডাকলে বা শব্দে সাড়া না দিলে: শোনার পরীক্ষা করান।
  • ১২ মাসে বকবক বা ইশারা নেই, ১৬ মাসে শব্দ নেই, ২৪ মাসে দুই শব্দ নেই: শিশু চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।
  • মনে খটকা থাকলে: সেটাও যথেষ্ট কারণ। মায়ের অনুভূতিকে হালকা করে দেখবেন না।

সাধারণ প্রশ্ন

ছেলেরা কি সত্যিই দেরিতে কথা বলে, তাই চিন্তার কিছু নেই? কিছু শিশু, ছেলে বা মেয়ে, একটু দেরিতে শুরু করে এবং পরে ধরে ফেলে। কিন্তু "ছেলেরা দেরিতে বলে" কথাটি লক্ষণ এড়ানোর কারণ হতে পারে না। উপরের চেকলিস্টের কোনো সূচক মিললে চিকিৎসকের সাথে কথা বলাই নিরাপদ।

আমার বাচ্চা সব বোঝে কিন্তু বলে না। এটা কি ভালো লক্ষণ? বোঝার ক্ষমতা ভালো থাকা একটি ইতিবাচক দিক, আর বিশেষজ্ঞরা এটিকে গুরুত্ব দেন। তবে বোঝা ও বলা দুটোই দেখা দরকার। বলার ক্ষেত্রে দেরি থাকলে তা-ও মূল্যায়ন করান। আপনার নিজের বিচারে "সব বোঝে" মনে হলেও শ্রবণ পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।

স্পিচ থেরাপি শুরু করলে কি শিশুর ওপর চাপ পড়ে? ছোট শিশুদের থেরাপি সাধারণত খেলার মাধ্যমে হয়, কোনো কড়া পড়াশোনা নয়। থেরাপিস্ট আপনাকেও শেখান ঘরে কীভাবে একই কৌশল চালাবেন। ফলে প্রতিদিনের স্বাভাবিক সময়েই শেখা এগোয়।

ডাক্তার যদি বলেন "অপেক্ষা করুন", তখন কী করব? অপেক্ষার সময়টাকে শুধু বসে থাকা বানাবেন না। ঘরের কাজগুলো (ধারাবিবরণী, পছন্দ দেওয়া, ছবির বই, গান) নিয়মিত চালান এবং কবে আবার দেখাতে হবে জেনে নিন। মনে সংশয় থাকলে দ্বিতীয় মত নেওয়ার অধিকার আপনার আছে।


🌱 মিস পিয়ার মূল কথা: "আপনার সন্দেহ আপনার সন্তানের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রথম পদক্ষেপ। অপেক্ষা করে দুশ্চিন্তায় থাকার চেয়ে একবার বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া অনেক ভালো। আর ততক্ষণ রোজ গল্প, গান আর ভালোবাসার কথায় ঘর ভরে রাখুন।"

আরও পড়ুন