শিশুর জিহ্বা ও ঠোঁটের জড়তা দূর করার ৫টি ফুঁ দেওয়ার খেলা (Blowing Games)

ফনিক্স ও ভাষা · 2026-10-08

"ও বলতে চায় 'পানি', কিন্তু শোনায় 'পাণি' বা 'পানী'-র মতো কিছু। আমরা বুঝি, বাইরের লোক বোঝে না।" "কথা বলতে গেলে মুখ থেকে লালা পড়ে, ঠোঁট ঠিকমতো বন্ধ হয় না। এটা কি ঠিক হয়ে যাবে?"

এমন কথা শুনলে মা-বাবার মনে দুশ্চিন্তা আসাটা স্বাভাবিক। শিশুর কথা পরিষ্কার না হওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে, আর তার সবগুলো ঘরোয়া খেলায় সমাধান হয় না। তবে একটা বিষয় অনেক মা-বাবা জানেন না। কথা বলা আসলে ঠোঁট, জিভ, চোয়াল আর গালের পেশির সূক্ষ্ম সমন্বয়। এই পেশিগুলো শক্ত ও নমনীয় হলে উচ্চারণ সহজ হয়। আর পেশির ব্যায়াম করানোর সবচেয়ে আনন্দময় উপায় হলো ফুঁ দেওয়ার খেলা।

দ্রুত উত্তর: ঠোঁট ও জিভের পেশি সক্রিয় করার সবচেয়ে সহজ ঘরোয়া উপায় হলো ফুঁ দেওয়ার খেলা, যেমন তুলার বল দৌড়, সাবানের বুদবুদ, পালক ভাসানো আর স্ট্র দিয়ে ফুঁ। দিনে ৫–১০ মিনিট মজার ছলে করলে ঠোঁট গোল করা ও নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস তৈরি হয়। এগুলো সহায়ক অনুশীলন, উচ্চারণে দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে শিশু চিকিৎসক বা স্পিচ থেরাপিস্টের পরামর্শ নিন।

ফুঁ দেওয়ার খেলায় কী হয়

ফুঁ দিতে হলে ঠোঁট গোল করতে হয়, গাল ফোলাতে হয়, নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এই সবকিছু কথা বলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সঙ্গে আছে:

  • ঠোঁটের শক্তি ও নমনীয়তা: প, ফ, ব, ম, উ-এর মতো ধ্বনিতে ঠোঁটের কাজ বেশি।
  • নিঃশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ: লম্বা বাক্য বলতে হলে দম ধরে রাখা দরকার।
  • জিভের নড়াচড়া: কিছু খেলায় জিভও সক্রিয় হয়।
  • মনোযোগ: একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ফুঁ দিতে গিয়ে শিশু আপনার নির্দেশ শোনে এবং মানে।

মনে রাখবেন, এগুলো সহায়ক অনুশীলন, চিকিৎসা নয়। তবে এগুলো যে ক্ষতিকর নয়, বরং মজার, এটা নিশ্চিত।

৫টি ফুঁ দেওয়ার খেলা

খেলা ১: তুলার বল দৌড় (Cotton Ball Race)

লাগবে: কয়েকটি তুলার বল, সমতল টেবিল, দুটি বই (ফিনিশ লাইন বোঝাতে)।

টেবিলের এক প্রান্তে তুলার বল রেখে বলুন, "চলো, ফুঁ দিয়ে বলটাকে ওই পাশে নিয়ে যাই!" শিশু ঠোঁট গোল করে ফুঁ দেবে। প্রথম দিকে ধীরে এগোবে, কয়েকদিন পর জোরে যাবে। শিশুর সঙ্গে আপনিও প্রতিযোগিতায় নামুন।

খেলা ২: সাবানের বুদবুদ

লাগবে: বুদবুদ বানানোর তরল ও কাঠি। ঘরে সাবান-পানি মিশিয়েও করা যায়।

বুদবুদ ফোলানো ঠোঁট গোল করে ধীরে ধীরে ফুঁ দেওয়ার শ্রেষ্ঠ অনুশীলন। জোরে ফুঁ দিলে বুদবুদ ভেঙে যায়, আস্তে দিলে বড় হয়। এতে শিশু নিঃশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ নিজে নিজেই শেখে।

খেলা ৩: পালক ভাসিয়ে রাখো

লাগবে: একটি পরিষ্কার হালকা পালক।

পালকটি তুলে ধরে ফুঁ দিয়ে ওপরে ভাসিয়ে রাখার লক্ষ্য দিন। "দেখো, পাখির পালকটা যেন মাটিতে না পড়ে!" ছোটদের জন্য এটা বেশ কঠিন, তাই শুরুতে একবার ফুঁ দিয়েই উচ্ছ্বাস করুন।

খেলা ৪: স্ট্র দিয়ে ফুঁ ও চোষা

লাগবে: একটি পরিষ্কার স্ট্র, একটি গ্লাস পানি, কয়েকটি ছোট কাগজের টুকরো।

প্রথমে স্ট্র দিয়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে বুদবুদ তোলা। তারপর স্ট্রতে চুষে কাগজের টুকরো তুলে অন্য জায়গায় রাখা। চোষা আর ফোঁকা দুটোই ঠোঁট ও গালের পেশিকে কাজে লাগায়। খেয়াল রাখুন, ছোট শিশু যেন পানি ফেলে না দেয় বা মুখে কাগজ না ঢোকায়। সবসময় পাশে থাকুন।

খেলা ৫: বেলুন ফোলানো ও বাঁশি

লাগবে: বেলুন বা খেলনার বাঁশি।

বেলুন ফোলানো বেশ কঠিন, বিশেষ করে ছোটদের জন্য। বড়রা বেলুনটি আগে একটু টেনে নরম করে দিন। শিশু দম নিয়ে ফুঁ দেবে, আপনি সহায়তা করবেন। সতর্কতা: ছেঁড়া বেলুনের টুকরো গিলে ফেলার ঝুঁকি আছে, তাই সবসময় তদারকিতে এবং বেলুনের টুকরো সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে ফেলুন। তিন বছরের নিচে বেলুন এড়িয়ে স্ট্র বা বুদবুদ বেছে নিন। বাঁশি একটি নিরাপদ বিকল্প।

জিভ ও ঠোঁটের আরও কিছু খেলা

ফুঁ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ছোট ছোট আয়না-খেলাও করা যায়।

  • আয়নার সামনে বসে জিভ বের করা, ওপরে-নিচে তোলা, ডানে-বামে নাড়ানো।
  • ঠোঁট চুমুর ভঙ্গিতে গোল করা, তারপর বড় করে হাসা।
  • গাল ফুলিয়ে "বেলুন" হওয়া, তারপর হাত দিয়ে চাপ দিয়ে হাওয়া ছেড়ে দেওয়া।
  • মধু বা জ্যাম ঠোঁটের চারপাশে হালকা লাগিয়ে জিভ দিয়ে চাটতে বলা (অ্যালার্জি না থাকলে এবং এক বছরের বেশি বয়সে)।

সব কিছুই আনন্দে করান, পরীক্ষার মতো নয়।

নমুনা কথোপকথন

আপনি: "আজ আমরা ঝড় বানাব! আমি হব বাতাস, তুমি হবে ঝড়। এই তুলার বলগুলো হলো মেঘ। ফুঁ দিয়ে দেখি তো কে আগে মেঘ উড়িয়ে দিতে পারে?" শিশু (ফুঁ দেয়): "ফু-উ-উ!" আপনি: "ওয়াও! মেঘ তো দৌড়ে পালাচ্ছে! আবার! এবার একটু আস্তে ফুঁ দিয়ে দেখো তো, মেঘ কি আস্তে যায়?"

যা করবেন না

  • জোর করে করাবেন না। শিশু না চাইলে অন্য দিন চেষ্টা করুন।
  • একসঙ্গে দশ মিনিটের বেশি টানবেন না, ছোটরা হাঁপিয়ে যেতে পারে।
  • ছোট জিনিস (বোতামের মতো) দিয়ে ফুঁয়ের খেলা খেলবেন না। গিলে ফেলার ঝুঁকি আছে।
  • অন্যের সামনে "দেখো, পারে না" বলে লজ্জা দেবেন না।
  • ঠান্ডা লেগে নাক বন্ধ থাকলে ফুঁ দেওয়ার খেলা থামিয়ে দিন।

কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন

আমি শিক্ষিকা, চিকিৎসক নই, তাই এখানে কোনো রোগ নির্ণয় করা হচ্ছে না। তবে নিচের লক্ষণ দেখলে শিশু চিকিৎসক বা স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

  • তিন-চার বছরের পরও পরিচিত লোকজনও শিশুর কথা বুঝতে পারছে না।
  • খাবার চিবাতে বা গিলতে অস্বাভাবিক কষ্ট হচ্ছে।
  • জিভ খুব ছোট বা বাঁধা (জিভের নিচের টান) মনে হচ্ছে।
  • ক্রমাগত লালা পড়ছে, ঠোঁট বন্ধ রাখতে পারছে না।
  • কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই আটকে যাচ্ছে বা মুখ বেঁকে যাচ্ছে।
  • শ্রবণশক্তি নিয়ে সন্দেহ।

ঘরোয়া খেলা সাহায্য করে, কিন্তু বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নের বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্ন

ফুঁ দিয়ে খেললে কি সত্যিই উচ্চারণ ঠিক হয়?

সরাসরি নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। তবে ঠোঁট ও গালের পেশি সক্রিয় থাকা, নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ বাড়া কথা বলার প্রস্তুতিতে সহায়ক, এমনটাই অনেক শিক্ষক ও থেরাপিস্টের অভিজ্ঞতা।

দিনে কতবার করাব?

দিনে একবার বা দুইবার, প্রতিবার ৫-১০ মিনিট যথেষ্ট। নিয়মিত হওয়াটাই বেশি জরুরি।

ছোট শিশুদের জন্য কোন খেলা নিরাপদ?

বুদবুদ ও তুলার বল দৌড় তুলনামূলক নিরাপদ, তদারকিতে। বেলুন ও ছোট জিনিস এড়িয়ে চলুন।

আমার সন্তান ফুঁ দিতেই পারে না, কী করব?

চিন্তা করবেন না। আপনি নিজে মোমবাতির মতো কিছু ছোট জিনিসে ফুঁ দিয়ে দেখান, তারপর হাতের তালুতে নিজের নিঃশ্বাস টের পেতে দিন। ধীরে ধীরে অনুকরণ করবে।

🫧 মিস পিয়ার মূল কথা: "কথা ফোটানোর পথ সবসময় বইয়ের ভেতর দিয়ে যায় না। একটা বুদবুদ, একটা পালক, আর আপনার হাসি, এতেই ঠোঁট-জিভ জেগে ওঠে। খেলুন, আনন্দ করুন, আর দরকার হলে নির্দ্বিধায় বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।"

আরও পড়ুন